জনবলের অভাবে বিলীন হয়ে যেতে পারে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল

চরম জনবল সংকটে লামা বন বিভাগ,তবুও চেষ্টার কমতি নেই লামা বনবিভাগের-

 

দেশের দক্ষিণপূর্ব সীমান্তের ওপারে বার্মার আরাকান রাজ্যের বিশাল পাহাড়, পর্বতমালা থেকে মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তি, যা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পাহাড়ি এলাকা কুরুপপাতা ও পোয়া মুহুরী হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। পরে চারটি উপজেলা আলীকদম, লামা, চকরিয়া ও পেকুয়ার মাটি ভেদ করে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।

নদীও বনাঞ্চলের উৎপত্তি :

নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিরামহীন চলার পথে আলীকদমের ইন্দু, সিন্দু, চকরিয়ার বাইস্যার ছড়া পর্যন্ত ১১৩টি ছোট বড় খাল ও ছড়া নদীতে মিশে গিয়ে মাতামুহুরীকে করে তোলে চির প্রাণযৌবন। আর এ নদীর তীরকে ঘিরে এ অঞ্চলে গড়ে উঠে প্রচীন সমাজ-সভ্যতা।

 

তৎসময়ে লামা-আলীকদমের সঙ্গে চকরিয়ার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল মাতামুহুরী নদীপথ। এককালে এই মাতামুহুরী নদীতে ভেসে চলতো বড় আকারের নৌকা ও সাম্পান।

মানুষ একদিন একরাত নৌকায় চড়ে পরবাস খেটে লামা-আলীকদমে পৌঁছত। তখন নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মাতামুহুরীর তীরে গড়ে উঠেছিল সাপ্তাহিক হাট-বাজার।

 

আর অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে বয়ে চলা এই নদীর নামেই রাখা হয়েছে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি মাতামুহুরি। মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রয়েছে বড় আকৃতির মাদার ট্রীসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছ।

কি কি আছে মাতামুহুরিতে-

মাতামুহুরী বনাঞ্চল (সাঙ্গু-মাতামুহুরী) বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের আধার। এখানে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৯ প্রজাতির উভচর এবং ১১ প্রজাতির বিরল পাখি রয়েছে ।

এই বনে রয়েছে এশিয়ান হাতি, চিতাবাঘ, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, পাহাড়ি ঝিরি ও খরস্রোতা নদী, ঘন চিরসবুজ গাছপালা এবং সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বড় বড় অরণ্য।

আয়তন:

মাতামুহুরী বনাঞ্চল (সাঙ্গু-মাতামুহুরী)সংরক্ষিত আয়তন ১লাখ ২হাজার একর।

জনবলের অভাবে বিলীন হতে পারে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের আধার সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল।
বান্দরবান জেলার লামা বনবিভাগের বিশাল এই বনাঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণ ও পাহারা দেয়ার জন্য মাত্র জনবল আছেন ৫জন।

ওই পাঁচজনের ভেতর মাতামুহুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেকসহ মোট ৫জন বলে জানিয়েছেন স্বয়ং রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেক।

মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলটির তিনি(মালেক) দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে মাতামুহুরি বনের কাঠ পাচার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম কমে গেছে বলে জানিয়েছেন মাতামুহুরি অঞ্চলের একাধিক স্থানীয়রা।

তবে তারা জনবলের বিষয় আশংকাও প্রকাশ করে বলেছেন, ৫/৬জন লোক দিয়ে দেশের অন্যতম বনাঞ্চল মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনভূমি ধরে রাখা যাবেনা- তাই লোকবল বাড়াতে হবে সংশ্লিষ্ট বনবিভাগকে।

লামা বনবিভাগের কোন রেঞ্জে কতজন জনবল?

অপরদিকে দেখা যায়, শুধু মাতামুহুরিতেই জনবল কম তা নয়, পুরো লামা বনবিভাগেই জনবল সংকট,
প্রতিবেদক দীর্ঘ ১মাস বান্দরবান জেলার লামা বনবিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ ও বনবিট নিয়ে কাজ করে যে জনবলের তথ্য সংগ্রহ করেছেন এতে দেখা যায়, নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জে মোট ২টা বিট রেঞ্জ সদরসহ মোট জনবল আছেন ৫জন। মাতামুহুরি রেঞ্জে ৫জন,ওদিকে বিশাল এলাকা নিয়ে লামা বনবিভাগের সবচেয়ে বড় রেঞ্জ হচ্ছে ডলুছড়ি রেঞ্জ সেখানে দেখা যায় মাত্র ৫জন।

তৈন রেঞ্জে কর্মকর্তাসহ মোট ৫জন।সাঙ্গু রেঞ্জে আছেন শুধু ৩জন।

লামা সদর রেঞ্জের বমু বিটে ৪জন।ইয়াংছা ক্যাম্পে ২জন,আবার লামা সদরেও মাত্র ৫জন।

এই বিভাগ ফরেস্টার:

তবে বনবিভাগের এক তথ্যে দেখা যায়, লামা বনবিভাগে ফরেস্টারের পোস্ট আছে ১২টা তবে বর্তমানে আছে ৫ জন, একই পদে খালি আছে আরো ৭ জন।

মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বমু রিজার্ভসহ পুরো লামা বনবিভাগকে পাহারা দেয়ার জন্য হাতে-কলমে ফরেস্ট গার্ড পোস্ট আছে ৪৩টা তবে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২জন।

এদিকে জনবলের অভাব বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড.মোল্যা রেজাউল করিম,তিনি বলেন শুধু মাত্র লামা বনবিভাগে জনবল সংকট তা নয় আমার পুরো চট্টগ্রাম সার্কেলেই আছেন মাত্র ৫৪%জনবল।
এই ৫৪পার্সেন্ট জনবল নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

 

অপরদিকে বান্দরবান জেলার লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,আমার যা লোকবল আছে তা দিয়ে ভালো ভাবে চালিয়ে যেতে পারতেছি আমার কোন সমস্যা হচ্ছেনা।

তবে এই লোকবল দিয়ে তো আপনার অধীনের রিজার্ভ বনাঞ্চল নিরাপত্তা হুমকির মুখে বললে তিনি তাও অস্বীকার করে বলেন- কোথাও কেউ গাছ বাঁশ কেটে আনলে সবাই ঢালাও ভাবে লিখে দেন লামার মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বমু রিজার্ভ থেকে নিয়ে যাচ্ছে সেটা বাস্তবে কিন্তু তা নয়।তবুও জনবল বাড়ানোর বিষয়টা তো আসলে কর্তপক্ষের ব্যাপার।

অপরদিকে বমু রিজার্ভের পাশে কুখ্যাত বনখেকো রহিম উল্লাহ মেম্বারের কাছে বমু রিজার্ভ নিরাপদ নয় বলেও জানান একাধিক সূত্র।

এই রহিম উল্লাহ মেম্বারের বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন লামা বনবিভাগের এক কর্মকর্তা।

এই রহিম উল্লাহ মেম্বারের বিষয়ে কয়টা জোত আছে কি ভাবে কি করবে সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন লামা বনবিভাগের লামা সদরের রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন।

  • একটি তথ্যে দেখা যায়, লামা সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কেএম কবির আসার মাত্র ২মাসেই মোট ২৪ টি বন অপরাধ উদঘাটন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।এবং ১১ টি যানবাহন, ১২৭০ ঘনফুট জ্বালানি ও ৭৯০ ঘনফুট বিভিন্ন ধরনের গোলকাঠ জব্দ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.