নিজস্ব প্রতিবেদক:
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এককভাবে কারো ওপর যেন নির্ভরশীল থাকতে না হয়, সেজন্যেই ব্রিকসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুইজারল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে বুধবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সফরের অন্যান্য বিষয়ের মত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে বৈঠকের কথাও তিনি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রিকস জোটের বর্তমান চেয়ার দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ব্রিকস জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান।
সিরিল রামাফোসা তখন বলেন, অগাস্টে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে জোটের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে মোমেন জানিয়ে ছিলেন আগামী আগষ্টে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্যপদ পাবে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এককভাবে নির্ভরশীলতার ব্যাখা না দিলেও গত কয়েকমাসের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্যদের বক্তব্যে স্পষ্ট, এটি যুক্তরাষ্ট্রকেই একক দেশ হিসাবে চিহ্ণিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রাধীন আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকও এরমধ্যেই পড়ে।
পরে সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন সাংবাদিক জানতে চান, ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের বাস্তবতায় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, সেই সময়ে ব্রিকসে যোগ দিলে কোনো সুবিধা বাংলাদেশের হবে কি না। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ব্রিকসে আমরা যোগ দেব এই কারণে, ব্রিকস প্রথম যখন এটার প্রস্তুতি নেয়, তখন থেকেই আমরা এর সঙ্গে ছিলাম এবং আছি। কিন্তু আমরা ফাউন্ডার মেম্বার হতে পারিনি। এখন আমরা চেয়েছি সেটার মেম্বার হতে।
“আমরা চাচ্ছি যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো একটার ওপর যেন নির্ভরশীলতা না হয়। কাজেই অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যেন আমাদের অর্থ বিনিময়ের সুযোগটা থাকে। আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো যেন আমরা সহজে ক্রয় করতে পারি, আমার দেশের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে পারি। সেই সমস্ত বিষয় বিবেচনায় করেই কিন্তু আমরা ব্রিকসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্ভুক্তিতে জোটের নাম হয় ব্রিকস। এই জোটের উদ্যোগে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই যাত্রা করে নিউ ডেভলেপমেন্ট ব্যাংক-এনডিবি। সে সময় বলা হয়েছিল, এসব দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে নিউ ডেভলেপমেন্ট ব্যাংক।
নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সূচনাতেই বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় উঠেছিল। তখন চীনের উদ্যোগে প্রস্তাবিত এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকে (এআইআইবি) যোগদানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল সরকার।
ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এক ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাতে ইতিবাচক সাড়া দেন। এর পরে ব্যাংকটিতে যুক্ত হওয়ার পথে যাত্রা শুরু হয়। ধাপে ধাপে আনুষ্ঠানিকতাগুলো শেষে ২০২১ সালের ২০ অগাস্ট এনডিবির বোর্ড অব গভর্নরসের সভায় নতুন সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের যোগদান অনুমোদিত হয়। বর্তমানে এনডিবির তহবিল ৫০ বিলিয়ন ডলার। ব্রিকসভ‚ক্ত দেশগুলোতে এনডিবি ৩৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এনডিবির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ব্রিকসের সাধারণ সভায় জানিয়েছেন, এখন ব্রিকসভ‚ক্ত দেশগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০ ভাগ নিজেদের মূদ্রায় বিনিয়োগ করে। আগামী বছরে তা ৩০ ভাগ করা হবে।
বাংলাদেশই ব্রিকস জোটের বাইরের প্রথম দেশ, যারা এই ব্যাংকের সদস্যপদ পেয়েছে। এবার মূল জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করল বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সেই সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না।উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন।”
পরে তিনি বলেন, “এখানে আমরা দেখব যে বিকল্প কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অর্থ ব্যবহারের ব্যবস্থা কেউ যদি নেয়, আমরা তার সঙ্গে আছি। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছি, আমরা যেন আমাদের নিজস্ব অর্থের বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারি, সেই পদক্ষেপটাও কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে নিয়েছি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে চীনা মূদ্রা ইয়ানে রাশিয়ার পাওনা পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে রূপীতে বাণিজ্য করার বিষয়ে আলোচনা চলছে ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শুধু ডলারের ওপর নির্ভরশীল না, আমরা নিজেরা নিজেদের অর্থে বিভিন্ন দেশের সেঙ্গ যেন বিনিময় করতে পারি, কেনাবেচা যাতে যা লাগে করতে পারি, সেই পদক্ষেপও নেওয়া আছে। যখন এটা কার্যকর হয় তখন আপনারা এটা দেখতে পাবেন।
এরবাইরে প্রধানমন্ত্রী,আগামী নির্বাচন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভ’মিকা। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনদ্বীপের বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকবেন না বলে জানান। তিনি নরেন্দ্রমোদীর যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রসঙ্গে বলেন, ভারত নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিবে। তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার দক্ষতা আছে।