ঝার ফুকু প্রতারণাতেই কোটি টাকার মালিক দেওদীঘি স্টেশন মসজিদের ইমাম!

জিন তাড়ানোর নামে বোবা শিশুর কানও খেলো এওচিয়ার মাওলানা ওসমান

সৈয়দ আককাস উদদীন 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জ্বিন তাড়ানো ও বুবাকে
কথা বলানোর নামে চার বছরের এক শিশুর কান পাঠালেন এক হুজুর। একই সাথে কান পাঠালেন ঐ শিশুর মায়ের।

ঐ হুজুরের নাম মোঃ ওসমান গনি। তিনি সাতকানিয়া উপজেলাধীন এওচিয়া ইউনিয়নের দেওদিঘি ষ্টেশন জামে মসজিদের ইমাম।
অপরদিকে ভুক্তভোগীর নাম রহিমা আক্তার (চদ্মনাম)। তিনি সাতকানিয়া পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের সাতিপাড়া এলাকার মেয়ে।

ভুক্তভোগী রহিমা আক্তার বলেন, তার শিশু সন্তান আব্দুল্লাহ(৪) জন্মের পর থেকেই কান্না করতে পারে ঠিকই কিন্তু কথা বলতে পারেনা। এজন্য তাকে ঢাকার পিজি হাসপাতালের ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার বলেছে তার সামনে কথা বলতে। তাহলে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার কোন পরিবর্তন না হওয়াতে আমার বাপের বাড়ির কিছু লোকজন বলেন তার জ্বিনের সমস্যা হয়েছে। অতএব ঝার ফুক করা দরকার। প্রথমে বিশ্বাস না হলেও এক পর্যায়ে সন্তানের কথা চিন্তা করে রাজি হলে আমাদের এলাকার মসজিদের ইমাম হফেজ মুরাদ ওসমান গণি নামক এই হুজুরের কথা বলেন। পরবর্তীতে আমি গত ৪ জুন (শনিবার) ঐ হুজুরের কাছে গেলে তিনি প্রথমে বিভিন্নভাবে আমাকে ইমপ্রেস করেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার ছেলে কথা বলবে বলে আশ্বস্থ করেন। কিন্তু তারপরে
হুজুর এবং আর কয়েকজন মিলে আমার ছেলেকে হাত পা চেপে ধরে তার কানের মধ্য দিয়ে কটন ঢুকিয়ে কানের পর্দা ফেটে ফেলেন। পরবর্তীতে আমার কানেও কটন ঢুকিয়ে দেন এবং আমারও একটি কান ফেটে যায়। পরে আমি আমার অপর কানে কটন ঢুকাতে না দিয়ে চলে আসি। এদিকে আমি এবং আমার ছেলের কান দুটি এখনো ঠিক হয়নি এবং আমার ছেলে কষ্ট অনুভব করছে।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ মুরাদের কাছে জানতে চাইলে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, আমি জানতাম ওসমান হুজুর ঝার ফুকের কাজ করেন। কিন্তু বোবা মানুষকে কথা বলানোর বিষয়ে আমি কিছু জানতাম না। তাছাড়া ওনার চিকিৎসার ধরনটাও ভিন্ন। যদি এটা সঠিক চিকিৎসা না হয়ে প্রতারনামূলক কিছু হয় তাহলে ওনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ওসমান গণি বলেন, আমি তাদেরকে চিকিৎসা করাতে চাইনি। তারা নিজেরা জোর করে আমার কাছে এসেছেন। এছাড়া আমি বোবা মানুষকে কথা বলাতে পারিনা। যদি জ্বিনের কোন সমস্যা হয় তাহলে ভাল করতে পারি। এছাড়াও এসব চিকিৎসা একদিন করে কোন সুফল পাওয়া যায়না। নিয়মিত করলে ভাল ফলাফল পাবে।

তিনি আরো বলেন, আমি দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে চিকিৎসা করে আসতেছি। অনেকেই আমার হাতে ভাল হয়েছে। জিনের সমস্যার কারনে কথা বলতে না পারা অনেকেই আমার চিকিৎসার মাধ্যমে কথা বলতে পেরেছে।

তবে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত ওসমান গণি হুজুরের বাড়ী দোহাজারী হলেও তিনি এওচিয়া এলাকার ভোটার। তিনি এই জায়গায় দীর্ঘ ২৮ বছর যাবত আছেন। তিনি যে ঝার ফুক করেন তাও সত্য । তবে বুবা মানুষকে কথা বলানোর বিষয়টি তারা কখনো শুনেনি। কিন্তু বিভিন্ন সময় আরো কয়েকজনের কাছ থেকে মানুষের কান ফাটানো সম্পর্কে শুনা গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এধরণের প্রতারনামূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে
আইনগত পদক্ষেপ কি জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এসব প্রতারনামূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে এবং উপর মহল থেকে নির্দেশও রয়েছে। তবে ভুক্তভোগী যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহকারে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে এক্ষেত্রে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমাদের জন্য সুবিধা হবে।

জানতে চাইলে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত
পুলিশ সুপার বলেন, জনসাধারণকে সচেতন করতে আমরা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। বিট পুলিশিং এবং কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে আমরা সচেতনতার পাশাপাশি এসব প্রতারনামূলক কর্মকান্ড প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছি। এরপরেও যদি কেউ প্রতারনার শিকার হয় এবং এধরনের আঘাতের শিকার হয় আমাদের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিব।

জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে বৈদ্য ওজা বা এসবের ক্ষেত্রে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমাদের ব্যবস্থা নিতে সহজ হয়। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী যদি লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে অনুসন্ধানে জানাগেছে-মসজিদের এই ইমামককে এসব ভন্ডামী সহায়তা করেন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল।

যারা এই ভন্ড মাওলানা থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকেন নিয়মিত।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.