এক দশকে সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এত বড় আকারের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখেনি বাংলাদেশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রার মূল্য হ্রাসের মধ্যে অনিয়মিত আবহাওয়া এবং জ্বালানি আমদানির জন্য অর্থ প্রদানের অসুবিধার কারণে এমনটি ঘটছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে রয়টার্স।

এতে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মের শুরু থেকেই তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায়। তার মধ্যে জুন মাসের প্রথম থেকে শুরু হওয়া টানা বিদ্যুৎ সংকটে নাভিশ্বাস উঠছে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটির বেশির ভাগ জনগণের। সম্প্রতি বাংলাদেশের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, শিগগিরই এই সংকট কেটে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক বা গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিকারী দেশ। বৈশ্বিক এই শিল্প খাতে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেরও প্রধান উৎস এই গার্মেন্ট খাত। কিন্তু টানা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের প্রথম ৫ মাসের প্রতিদিন লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্ট খাতে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, তা ১১৫ দিনের সমান। অথচ ২০২২ সালের গোটা বছর লোডশেডিংয়ের কারণে ১১৩ দিনের সমান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে। জুন মাসের শুরু থেকেই সন্ধ্যার পর বা ভোরের দিকে লোডশেডিং হচ্ছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলা-শহর ও গ্রামে। কোনো কোনো এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে দিনের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

জুনের প্রথম সপ্তাহের প্রতিদিনই মোট চাহিদার তুলনায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। তার মধ্যে গত ৫ জুন সোমবার উৎপাদিত হয়েছে ২৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ। মে মাসে এই ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির মূল কারণ জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ১১ দশমিক ৫ গিগাওয়াট ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ৩ দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। জাতীয় গ্রিড অপারেটর সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির অভাবে গত সোমবার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন এক-চতুর্থাংশ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে।

এ ছাড়া ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতিদিন সরবরাহ করে ৭ দশমিক ৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। ডিজেলের অভাবে সেসব কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।

চলমান এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে ডলারের ঘাটতি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিতরণকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গত এপ্রিলের শেষে এবং মে মাসের শুরুর দিকে সরকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করায় বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা বন্ধ করেছে এশিয়ার তিন বৃহৎ কোম্পানি সিনোপেক, ইন্ডিয়ান অয়েল এবং ভিটোল। নতুন তেলের জোগান আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের জ্বালানি তেলের মজুত দ্রুত কমছে বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছিল বিপিসি।

গত এক বছরে ছয়বার ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। তার মধ্যে গত এপ্রিলে টাকার মান যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা গত ৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস বা খনিগুলো থেকে গ্যাসের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং গ্যাস রপ্তানিকারী অন্য কোনো দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস চুক্তি করতে না পারার ফলে ২০২২ সাল থেকেই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে ঘাটতি শুরু হয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য এলএনজির দাম হ্রাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খানিকটা বেড়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা একেবারেই নগণ্য। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলারের মজুত কমতে থাকায় এই আমদানিও এখন সংকটের মুখে পড়েছে।

সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা। ২০২৩ সালে এই নির্ভরশীলতা পৌঁছেছে ১৪ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ৮ শতাংশ।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.