বনবিভাগ: পদোন্নতির নামে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ দুর্নীতির বলয়

অনিয়ম-দুর্নীতিতে পদোন্নতি, মানা হচ্ছেনা সিনিয়রিটি -

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম 

 

বন সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত বনবিভাগ বর্তমানে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও বিদ্যমান বিধিমালা উপেক্ষা করে পদোন্নতির নামে একটি ভয়াবহ দুর্নীতির বলয় গড়ে উঠেছে-এমন অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী বন কর্মকর্তারা।

 

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও বন বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত পদোন্নতি বঞ্চিতদের হতাশা কাটছে না। অভিযোগ ওঠেছে, পদোন্নতির প্রক্রিয়া চললেও জ্যেষ্ঠতা মানা হচ্ছে না। ফলে সিনিয়ররা বঞ্চিত থাকছেন। জুনিয়ররা সিনিয়রিটি পেতে যাচ্ছেন। যা হতাশার কারণ।

 

বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে পদোন্নতি বঞ্চিত ফরেস্টার ও বন প্রহরীদের পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে বনকর্মীরা হতাশা কাটিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। উপদেষ্টার এই পদক্ষেপকে পুঁজি করে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মচারী কোটি টাকার বাণিজ্য করেন। এতে বলি হতে হয় মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের।

অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, ন্যায়সঙ্গতভাবে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য হয়েও বঞ্চিত একাধিক বন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। দায়ের করা মামলাগুলো আমলে নিয়ে আদালত পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ১৫ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির ওপর নিষেধাজ্ঞা (স্ট্রে অর্ডার) জারি করেন। যার মামলা নং, ( ১০/২৬) (৩৭৬/২৬) (২৪৭/২৫)।

আদালতের এ আদেশে পদোন্নতি প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত থাকলেও, বনবিভাগে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

 

এসব অনিয়ম ও অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে নিয়মবহির্ভূতভাবে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পাওয়া আমীরুল হাসান, খান জুলফিকার, আব্দুল আহাদ, নাজমুল হাসান ও নাজমুল সর্দারসহ কয়েকজন অসাধু ও প্রভাবশালী বন কর্মকর্তা।

 

তাদের নেতৃত্বেই অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে পদোন্নতি আদায়ের একটি সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই চক্রটি প্রভাব খাটিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি পাইয়ে দিতে কাজ করছিল।

 

পদোন্নতি এখন যোগ্যতার নয়, টাকার অঙ্কের হিসাব

বনবিভাগের অভ্যন্তরীণ নথি ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেপুটি রেঞ্জার থেকে রেঞ্জার পদে পদোন্নতি এখন আর জ্যেষ্ঠতা বা কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করছে না। বরং কে কত দ্রুত ও কত টাকা দিতে পারছে-সেটাই হয়ে উঠেছে প্রধান বিবেচ্য।

অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্টার ব্যাচভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমে জনপ্রতি মোটা অংকের অর্থ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মহলকে মোটা অংকের আর্থিক কমিশন দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার আগে পদোন্নতি নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

মাঠ পর্যায়ে ফরেস্টারদের এই পদোন্নতির বিষয়ে দুইটি কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

প্রথম একটি কল রেকর্ডের কথোপকথনে শুনা গেছে রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পেতে খরচপাতির টাকা তুলতে ব্যাচভিত্তিক কয়েকজনকে সমন্বয়কের তালিকায় রাখা হয়েছে। অসাধু ও পদোন্নতির অযোগ্যদের বেশি অর্থ আদায় ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যারা পদোন্নতি পাবেন তাদের ক্ষেত্রে শুধু মাত্র খরচের টাকা আদায় করা হচ্ছে এভাবে চক্রের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্য আরেকটি কল রেকর্ডে শুনা যাচ্ছে, চট্রগ্রাম হাটহাজারি রেঞ্জের সাইফুল নামের ডেপুটি রেঞ্জার থেকে ৭/৮ লাখ টাকা মতো নিয়েছে। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলেছে। ২য় রেকর্ডে এমন মন্তব্য শুনা গেছে।

মামলার জটের মাঝেই দ্রুত পদোন্নতির হিড়িক

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা, বিভাগীয় তদন্ত ও ফৌজদারি মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও তাদের ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ মামলা চলমান অবস্থায় পদোন্নতি পাওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই রেঞ্জার পদে উন্নীত হওয়ার তদবির শুরু করেছিলেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই তড়িঘড়ি পদোন্নতির পেছনে রয়েছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। না হলে সমতা ও জৈষ্ঠতা নীতিমালার সমস্যা সামাধানে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় কিভাবে পুনরায় পদোন্নতির কার্যক্রমে সহযোগীতা করেন সংশ্লিষ্টরা এমন মন্তব্যও করেন ভুক্তভোগীরা।

আরেক কর্মকর্তা একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তীতে আদালতে হাজির হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং বর্তমানে তিনি কারাভোগ করছেন বলে জানা গেছে।

এ ধরনের অনিয়ম, মামলাজট এবং পদোন্নতি বিধিমালার অসঙ্গতি নিরসনের দাবিতে একাধিক ভুক্তভোগী বন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট মহলে লিখিত অভিযোগ ও মামলা দায়ের করেন। তবে অভিযোগ ও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না করেই পুনরায় রেঞ্জার পদে পদোন্নতির জন্য ৪১১ জনের নামে প্রত্যয়ন প্রদান করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ-যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

৭০টির বেশি অভিযোগ,আদালতে একাধিক মামলা

এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা চুপ থাকেননি। প্রধান বন সংরক্ষক কার্যালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি)’তে অন্তত ৭০টির বেশি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ন্যায়বিচারের আশায় একাধিক ডেপুটি রেঞ্জার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। মামলা নম্বর ১০/২৬, ৩৭৬/২৫ ও ৩৪৭/২৫ এখনো বিচারাধীন।
তাদের প্রশ্ন-যে পদোন্নতির বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান, সেই পদে কীভাবে আবার নতুন করে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হয়?

হাতে আসা মামলার নথি ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পদোন্নতি নীতিমালা লঙ্ঘন ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে অসাধু উপায়ে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগে বর্তমানে ছয়টির বেশি মামলা চলমান রয়েছে।

এ সংক্রান্ত প্রথম মামলাটি দায়ের করেন রতন লাল মহত। ওই মামলার প্রেক্ষিতে আদালত প্রাথমিকভাবে পদোন্নতির ওপর স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) জারি করেন। পরে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেই আদেশ উত্তোলন (উইথড্র) করা হয়।

তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। সর্বশেষ ১৫ জানুয়ারি দায়ের হওয়া আরও তিনটি পৃথক মামলায় আদালত পুনরায় ডেপুটি রেঞ্জার পদে বিতর্কিত পদোন্নতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আদালতের এ আদেশের ফলে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কার্যক্রম বর্তমানে আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।

 

 

 

 

বনবিভাগের ভেতরে অসন্তোষ, ভাঙনের শঙ্কা

অবসরপ্রাপ্ত একাধিক বন কর্মকর্তা বলছেন, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রাখলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোতেই পড়বে। বনবিভাগের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি বাহিনীতে যখন পদোন্নতি নিয়ে এমন অনিয়ম হয়, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ে, বাড়ে অসন্তোষ ও অবিশ্বাস। বিষয়টি পরিপূর্ণ ত্রুটি সামাধান না করে পুনরায় পদোন্নতি দিলে পুরো ডিপার্টমেন্ট নিয়ে নানামূখী বিতর্ক ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।

কর্মকর্তাদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও নিজেদের দাবি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডেপুটি রেঞ্জার বলেন, ২৮৯ জন ডেপুটি রেঞ্জার যাদের রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পাইয়ে দেবার কথা, তাদের না দিয়ে নিয়মবহির্ভূত ভাবে অন্যন্যদের পদোন্নতি দিতে মোটা অংকের টাকার মিশন চালাচ্ছে একটি অসাধু চক্র। সেখানে আমীরুল হাসান, আব্দুল আহাদ সহ বেশ কয়েকজন জড়িত রয়েছে। অথচ এসব সামাধানে আমাদের মামলা চলমান রয়েছে। তারা মামলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উর্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে পদোন্নতি পাইয়ে দিতে কাজ করছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমন পদোন্নতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বন কর্মকর্তা বলেন, জ্যেষ্ঠতা ও সমতা নির্ধারণ নিয়ে মামলা চলছে। এই জট নিরসন না করে পদোন্নতি দেওয়া মানে পুরো বিধিমালাকেই অগ্রাহ্য করা।

 

পদোন্নতি পাইয়ে দিতে মাঠ পর্যায়ে ডেপুটি রেঞ্জার থেকে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযুক্ত ও তাদের সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করে আব্দুল আহাদ বলেছেন, যারা এসব মিথ্যাচার করতেছে তারা হয়তো সিনিয়রিটি পান নাই তাই।

টাকা তুলার বিষয়টি সম্পুর্ণ মিথ্যা। আর পদোন্নতি দিবে হাই অথোরিটি এইখানে আমাদের কি।

জ্যেষ্ঠতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন যেখানে প্রশাসনের মূল ভিত্তি, সেখানে বনবিভাগে পদোন্নতিকে ঘিরে এমন অভিযোগ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মনে করেন অনেকেই।

এদিকে এসব বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মামলার নিষেধাজ্ঞা বা স্ট্রে থাকলে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই,তবে মামলা চলমান থাকা কালীন পদোন্নতির বিষয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, অনেকেই পিএসসিতে অভিযোগ দিয়েছেন,সেটা আমি অবগত হয়েছি। আমি পিএসসিতে বলেছি যেহেতু অভিযোগ দিয়েছেন আপনারা যাচাই-বাছাই করেন কোন ত্রুটি পেলে আমাদের জানাবেন আমরা পরবর্তী এগুলা সংশোধন করে পাঠাব।

কর্ম কমিশন ( পিএসসি)র একাধিক কর্মকর্তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও কারো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে পিএসসি’র চেয়ারম্যান এর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো: আকতারুজ্জামান কল রিচিভ করে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ব্যস্ত বলে কল কেটে দেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.