এসএম পিন্টু
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি সমুদ্রবন্দর আর এই দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরই হলো চট্টগ্রাম বন্দর। এটি দেশের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
তাই বন্দরের সক্ষমতা, দক্ষতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা মানে পুরো অর্থনীতির গতিকে সচল রাখা।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে বন্দর শুধু পণ্য ওঠানামার স্থান নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সংযোগের এক বিশাল প্লাটফর্ম। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে রক্ষার জন্য এই বন্দর অপরিহার্য।
ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সৃষ্ট জটিলতাগুলো সমাধান করা এবং এর ইতিবাচক দিকগুলোকে আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তাই আন্দোলন সংগ্রাম যাই বলেন তা যেন বন্দর তথা দেশের ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথের গুরুত্ব অপরিসীম। চট্টগ্রাম বন্দর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বহু দশক ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো এই বন্দর আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বন্দরগুলোর একটি। প্রতিদিন অসংখ্য জাহাজ এখানে নোঙর করে, হাজার হাজার কন্টেইনার ওঠানামা করে, এবং কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। এই কার্যক্রম শুধু সরকারের রাজস্ব বাড়ায় না, বরং দেশের শিল্পখাতকে সচল রাখে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারের সাথে যুক্ত করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, তার অধিকাংশ পণ্য এই বন্দরের মাধ্যমেই বিদেশে যায়।
একইভাবে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, সবকিছুই এই বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। তাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো মানে দেশের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করা।
তবে বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রাম বন্দর আজ নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির চাপ, সীমিত অবকাঠামো, যানজট, কন্টেইনার জট, খালাসে বিলম্ব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে বন্দরের ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। কখনো কখনো জাহাজগুলোকে বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়, যার ফলে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয় আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের।
এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে, ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়।
বন্দরের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সংযোগব্যবস্থা। বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে হলে সড়ক ও রেল যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, বন্দর থেকে বের হওয়া ট্রাকগুলো দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকে।
এতে সময় নষ্ট হয়, পণ্যের ক্ষতি হয়, এবং ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যায়। তাই শুধু বন্দরের ভেতরের ব্যবস্থাপনা উন্নত করলেই হবে না; বন্দরের সাথে যুক্ত পুরো লজিস্টিক নেটওয়ার্ককে আধুনিক করতে হবে।
ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও একটি জরুরি বিষয়। উন্নত দেশগুলোর বন্দরে এখন স্বয়ংক্রিয় ক্রেন, স্মার্ট কন্টেইনার ট্র্যাকিং, অনলাইন কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, এসব ব্যবস্থার কারণে সময় ও খরচ দুইই কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। যদি সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে দুর্নীতি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কাজের গতি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এর কৌশলগত অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই বন্দর শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, নেপাল, ভুটান এমনকি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্যও একটি সম্ভাবনাময় ট্রানজিট হাব হতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
ইতোমধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে, যা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বন্দরকে ঘিরে কর্মসংস্থানের সুযোগও কম নয়। সরাসরি বন্দরে কাজ করেন হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারী। পরোক্ষভাবে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শিপিং এজেন্সি, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, ব্যাংকিং, বীমা—অসংখ্য খাত এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ একটি সচল বন্দর মানে লাখো মানুষের জীবিকা নিশ্চিত হওয়া। তাই বন্দরের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি সামাজিক উন্নয়নের অংশও।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারলে ট্রানশিপমেন্ট খরচ কমবে, সময় বাঁচবে এবং বাংলাদেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প সেই সম্ভাবনারই একটি প্রতিফলন। এটি পুরোপুরি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং দেশের বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ জনবল তৈরি। আধুনিক বন্দর পরিচালনা করতে হলে প্রশিক্ষিত এবং প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর প্রয়োজন।
নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং কর্মপরিবেশ উন্নত করা গেলে বন্দরের কার্যক্ষমতা অনেক বাড়বে। একইসঙ্গে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা হলে কর্মক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
পরিবেশগত দিকটিও উপেক্ষা করা যাবে না। বন্দরের কার্যক্রম বাড়ার সাথে সাথে দূষণের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সমুদ্রের জীববৈচিত্র রক্ষা করা জরুরি। টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি “সবুজ বন্দর” গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীরা যদি দ্রুত এবং হয়রানিমুক্ত সেবা পান, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। এজন্য এক-স্টপ সার্ভিস চালু করা, অনলাইন প্রক্রিয়া বাড়ানো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ বন্দরই পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যে সম্ভাবনা রয়েছে তা শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি হতে পারে। “ব্লু ইকোনমি” বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির প্রসার ঘটাতে হলে শক্তিশালী বন্দর অপরিহার্য। মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি, সমুদ্র পর্যটন, সবকিছুর সাথে একটি আধুনিক বন্দরের সম্পর্ক গভীর।
সরকার ইতোমধ্যে বন্দরের উন্নয়নে নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ, চ্যানেল ড্রেজিং, সড়ক ও রেল সংযোগ উন্নত করা ইত্যাদি। তবে এসব প্রকল্প দ্রুত এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নে গতি না থাকলে তার সুফল পাওয়া যায় না।
বন্দরকে বাঁচাতে হলে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি খাত, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। কারণ বন্দর সচল থাকলে অর্থনীতি সচল থাকবে, আর অর্থনীতি সচল থাকলে দেশের মানুষও এগিয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর একদিনে এই অবস্থানে পৌঁছায়নি। বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এটি আজকের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, সঠিক পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। যদি আমরা আজকের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি আরও শক্তিশালী অর্থনীতি পাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি স্থাপনাকে রক্ষা করা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখার অঙ্গীকার। বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের এই বন্দরকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতেই হবে।
কারণ একটি শক্তিশালী বন্দরই পারে একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তি গড়ে তুলতে।
অতিসম্প্রতি নির্বাচন ও রমজানকে সামনে রেখে এনসিটি ইস্যুতে বন্দরে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিভিন্ন সংগঠনের সম্মতি এটিকে আরো বেগবান করছে।
এখানে সরকার ও আন্দোলনকারী উভয়কেই দেশের কথা চিন্তা করতে হবে সবার আগে।
দেশের স্বার্থে যেটির গুরুত্ব বেশি হবে সেটিই সকলকে মেনে নিতে হবে।
লবিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর দিকে তাকালে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। যেমন, চীনের সমুদ্রবন্দরগুলো বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যস্ততম, যার মধ্যে সাংহাই বন্দর বছরে ৪৭ মিলিয়নের বেশি টিইইউ কন্টেইনার পরিচালনা করে এটি তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্য আধিপত্যের মূল ভিত্তি। বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি ব্যস্ততম বন্দরের বেশিরভাগই চীনের, যা তাদের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি নির্দেশ করে। ২০২৫ সালে চীনের সামগ্রিক রাজস্ব ৪.৬ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২০২২ সালের তথ্যানুযায়ী, চীন সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩.৭১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এছাড়া, দক্ষিণ চীন সাগর ও আশেপাশের এলাকা দিয়ে বার্ষিক প্রায় ৭.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বিশ্বের বৃহত্তম এই রপ্তানিকারক দেশটির অর্থনীতিতে সমুদ্রপথের বাণিজ্যের অবদান অত্যন্ত বিশাল।
সিঙ্গাপুর সমুদ্রবন্দর বিশ্বের আরেকটি ব্যস্ত ও বৃহত্তম কন্টেইনার টার্মিনাল, যা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি বছরে প্রায় ৩২.২ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার পরিবহন করে। এই বন্দরটি লজিস্টিকস, জ্বালানি ও সামুদ্রিক পরিষেবা থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার আয় করে, যা সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।
ভিয়েতনামের সমুদ্র বন্দরগুলো দেশটির রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা প্রতি বছর শতশত বিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবহন করে।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রধান বন্দরগুলো প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৩ সালে ভিয়েতনামের সমুদ্র বন্দরগুলো ৩০ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার পণ্য হ্যান্ডেলিং করেছে, যা এই খাতের বিপুল আয়। ভিয়েতনামের মোট জিডিপির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে রপ্তানি খাত থেকে, যার সিংহভাগ সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সমুদ্রবন্দর (৫৮৭টি) থাকলেও, আয়ের দিক থেকে এশীয় বন্দরগুলো এগিয়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল। ১৩৮ বছরে দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম বিশ্বের ১১০টি দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এই বন্দর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানী-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা করে। বর্তমানে এটি বছরে প্রায় ৩.৪ মিলিয়নেরও বেশি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এবং দৈনিক ৫ হাজারের বেশি কন্টেইনার নাড়াচাড়ার মাইলফলক অর্জন করেছে। বন্দরের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধির জন্য নানা প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৭ লাখ টিইউউএস এ নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মূল ভিত্তি হবে মাতারবাড়ী ও বে-টার্মিনাল।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বন্দরে রূপান্তর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগকে অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ৫০টি সফটওয়্যার মডিউল, যার মাধ্যমে বন্দরকে ‘পেপারলেস প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ফলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও বিশ্বের আরো অনেক দেশ সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। আমাদের দেশটিও একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উজ্জল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তবে দেশের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সম্পদগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর আমরা যদি নিজেদের কারো ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের অচল করার চিন্তা করি তাহলে দিনের শেষে আমরাই আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে পেছনের দিকে ঘুরাতে থাকব।
কারণ পরিবেশ অস্থিতিশীল বা বন্দর অচল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে এদেশের আপামর জনসাধারণ বা খেটে খাওয়া মানুষের। বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি। দেশের স্বার্থে এই কঠিন বাস্তবতা সকল মহলে উজ্জীবিত হওয়া উচৎ। কারন দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করে এই বন্দরের ওপর।
তাই এই বন্দর যদি কোনো কারণে অচল হয়ে পড়ে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
প্রথমত, বন্দর অচল হলে আমদানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ শিল্পনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি এবং বিভিন্ন উপকরণের বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে। বন্দর বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে গেলে এসব পণ্য সময়মতো দেশে পৌঁছাবে না। ফলে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে শ্রমিকরা কাজ হারাবে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাবে।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানি খাত বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত, এবং এই খাতের পণ্য দ্রুত বিদেশে পাঠানো অত্যন্ত জরুরি। বন্দর অচল হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে না, ফলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; একবার তা ক্ষুণ্ন হলে পুনরুদ্ধার করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয়ত, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, ওষুধ, ভোগ্যপণ্য, অনেক কিছুই আমদানিনির্ভর। বন্দর অচল হলে সরবরাহ কমে যাবে, আর চাহিদা একই থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে, যা সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে।
চতুর্থত, সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আমদানি-রপ্তানি থেকে যে শুল্ক ও কর আদায় হয়, তা রাষ্ট্রের বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এই আয় কমে যাবে, ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও বাধা সৃষ্টি হতে পারে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সব খাতই এর প্রভাব অনুভব করবে।
এছাড়া পরিবহন ও লজিস্টিক খাতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। হাজার হাজার ট্রাকচালক, নৌযান কর্মী, গুদাম শ্রমিক, ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, অসংখ্য মানুষের জীবিকা বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বন্দর অচল মানে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি বন্দর অচল হওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে বিনিয়োগ করতে চান যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য। যদি বারবার বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কমে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
তাই বন্দর সচল রাখা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, উন্নত অবকাঠামো এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে যে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বা ইচ্ছাকৃত বাধা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সচল বন্দর একটি সচল অর্থনীতির প্রতীক। বন্দর থেমে গেলে থেমে যাবে উন্নয়নের গতি, ব্যাহত হবে বাণিজ্যের চাকা, এবং বিপর্যয়ের মুখে পড়বে পুরো দেশ। তাই জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে বন্দরকে সবসময় কার্যকর, নিরাপদ এবং গতিশীল রাখা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।