বন কেটে বাউন্ডারি শহীদের সাম্রাজ্য

 

সকালের সময় ডেস্ক

ময়মনসিংহের ভালুকার শালবন একসময় ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। সেই বনভূমির বিশাল অংশ আজ পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক রিসোর্ট, কনভেনশন সেন্টার, কটেজ, সুইমিং পুল, লেক, মিনি চিড়িয়াখানা ও বিনোদনকেন্দ্রে। প্রায় এক হাজার একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা বাউন্ডারি শহীদের ‘গ্রীণ অরণ্য পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট’ ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ এটি শুধু একটি রিসোর্ট নয়, বরং বনভূমি দখল, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের ক্ষমতার এক প্রতীক।

সরকারি দপ্তরের নথি বলছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, ফায়ার লাইসেন্স নেই, জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের তথ্য নেই, বন বিভাগের মামলাও চলমান। বন বিভাগের দাবি, প্রায় ৩০ একর বনভূমি জবরদখল করে রাখা হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে অবাধে চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। প্রশ্ন উঠছে একটির পর একটি সরকারি সংস্থা অনিয়মের কথা স্বীকার করলেও কেন থেমে আছে আইনী ব্যবস্থা?

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন মন্ত্রীর আশীর্বাদ, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং ক্ষমতার বলয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এই বিতর্কিত সাম্রাজ্য। তাদের ভাষায়, ভালুকায় শহীদের কথাই আইন, তিনিই প্রশাসন এমন ধারণা এতটাই শক্তিশালী যে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পান। আর এ কারণেই এখন প্রশ্ন শুধু একটি রিসোর্টকে ঘিরে নয় প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় বনভূমির ভবিষ্যৎ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও।

২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তর গ্রীণ অরণ্য পার্ক কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিয়ে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের নির্দেশ দেয়। নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

কিন্তু সেই সাত কার্যদিবস পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। পেরিয়ে গেছে পাঁচ বছরেরও বেশি সময়। এর মধ্যে বদলেছে সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, বদলেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতৃত্ব, বদলেছে দপ্তরের চেয়ার। কিন্তু বদলায়নি গ্রীণ অরণ্য পার্ককে ঘিরে প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সাধারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলে যেখানে দ্রুত অভিযান, জরিমানা কিংবা বন্ধের নির্দেশ দেখা যায়, সেখানে গ্রীণ অরণ্য পার্কের ক্ষেত্রে কেন বছরের পর বছর ধরে ব্যতিক্রম ঘটছে? কোন অদৃশ্য শক্তি বা প্রভাবের কারণে এতগুলো সরকারি সংস্থার আপত্তি ও অভিযোগের পরও প্রতিষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।

বন বিভাগ বলছে দখল আছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে ছাড়পত্র নেই। ফায়ার সার্ভিস বলছে লাইসেন্স নেই। জেলা প্রশাসন বলছে অনুমোদনের তথ্য নেই। স্থানীয়রা বলছেন জমি দখল হয়েছে। আবার বন বিভাগের মামলাও চলছে। এত অভিযোগ, এত নথি, এত প্রশ্নের পরও গ্রীণ অরণ্য পার্কের কার্যক্রম থেমে নেই।

ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রের একাধিক সংস্থা যখন একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের তথ্য দিচ্ছে, তখন আইন কেন থেমে আছে? বনভূমির ওপর গড়ে ওঠা এই বিতর্কিত সাম্রাজ্যের পেছনে কি শুধু প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষমতাই কাজ করছে, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর কোনো স্বার্থের জাল?

সেই উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ভালুকার শালবনের জন্য নয়, রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।

বনভূমি দখল, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন এবং চলমান বন মামলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রীণ অরণ্য পার্কে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান আয়োজনের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসনের বার্ষিক বনভোজন এই পার্কে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। একই বছর ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের ফ্যামিলি ডে এবং আরও কয়েকটি সরকারি ও প্রশাসনিক অনুষ্ঠানও সেখানে আয়োজন করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় জনগণ ও বিভিন্স দপ্তরের অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি এবং সরকারি কর্মসূচি আয়োজন কী ধরনের বার্তা দেয়? এতে কি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় না?

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবেও পরিবার-পরিজন নিয়ে নিয়মিত পার্কটিতে যাতায়াত করেন।

গ্রীণ অরণ্য পার্কের বিরুদ্ধে শুধু ভূমি ও পরিবেশগত অনিয়ম নয়, দর্শনার্থীদের হয়রানির অভিযোগও নথিভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া পরিবার নিয়ে পার্কে বেড়াতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে ভালুকা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, পার্কের কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মীরা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং পরবর্তীতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পার্কটির বিরুদ্ধে একাধিক নেতিবাচক পর্যালোচনা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার দুর্ব্যবহার, নিরাপত্তাহীনতা এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন।

ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, “গ্রীণ অরণ্য পার্ক” এর নামে কোনো জমির মালিকানা নেই। অথচ প্রায় এক হাজার একর এলাকায় পরিচালিত এই বাণিজ্যিক প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমির মধ্যে বাউন্ডারি শহীদ, তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে প্রায় ৩০৯ একর জমির তথ্য পাওয়া গেছে।

ভূমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নামে জমি না রেখে ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজনের নামে জমি ব্যবহার করে বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রকল্প পরিচালনা আইনগত প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে গ্রীণ অরণ্য পার্কের প্রকৃত ভূমি মালিকানা, পরিচালন কাঠামো এবং বৈধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিতর্কিত গ্রীণ অরণ্য পার্কে যাতায়াতের জন্য প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৯০ মিটার দীর্ঘ ও ১২ ফুট প্রশস্ত একটি সড়ক নির্মাণ করছে উপজেলা এলজিইডি। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখনও ভাঙাচোরা ও চলাচলের অনুপযোগী থাকলেও বাউন্ডারি শহীদের পার্কে যাওয়ার সড়কে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.