সাতকানিয়া-বন গবেষণা কেন্দ্রের অফিস ছাড়া সবই বেদখল,অভিযানের হদিস নেই বন গবেষণা কর্তৃপক্ষের

 

সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম থেকে 

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের আওতাধীন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের বনভূমি দখল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় ১ হাজার ৮২ একর আয়তনের এই গবেষণা কেন্দ্রের অন্তত ৫৯৫ একর জায়গা বর্তমানে বেদখলে চলে গেছে। ফলে গবেষণার জন্য নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বনভূমি সংকুচিত হয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি রেকর্ডসংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে গবেষণা কেন্দ্রের বনভূমি বেদখলে চলে গেছে। যদিও সংস্থাটির দাবি, মাহালিয়া ও ছদাহা মৌজার অধিকাংশ জায়গা রেকর্ডসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বেদখল হয়েছে। তবে শিগগিরই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হবে।

কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৭ সালের রিভিশনাল সার্ভে (আরএস) রেকর্ড অনুযায়ী ওই বন গবেষণা কেন্দ্রের নামে তিনটি মৌজায় প্রায় ১ হাজার ৮২ একর জায়গা রয়েছে। তার মধ্যে ছদাহা মৌজার ৪৪টি দাগে প্রায় ৬৯৪ একর, মাহালিয়া মৌজার তিনটি দাগে ২৮৪ একর ও কেঁওচিয়া মৌজার ছয়টি দাগে ১০৪ একর। তবে ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ সার্ভে (বিএস) রেকর্ডে ছদাহা ও মাহালিয়া মৌজার অধিকাংশ জায়গা খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আরও জানা যায়, এর অনেক বছর পর বন গবেষণা কেন্দ্র পটিয়া যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৭৬/১৯৯৯ রেকর্ড সংশোধনী মামলা করে। ওই মামলায় ২০০৮ সালে আদালত বন গবেষণা কেন্দ্রের পক্ষে রায় দেন। পরে চট্টগ্রাম ডেপুটি কমিশনার ও সংশ্লিষ্টরা হাইকোর্টে আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০২২ সালে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর বিএস রেকর্ড সংশোধনের কার্যক্রম শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত চলমান বলে জানা গেছে।

কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বনভূমির ভেতর একসময়কার সবুজ পরিবেশের পরিবর্তে অনেক অংশে গড়ে উঠেছে বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এমনকি অনেকে সেখানে পাকা ভবনও নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া পাহাড়ের চূড়া কেটে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি এবং গরুর খামার স্থাপন করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ পাহাড়ের পাদদেশের বিভিন্ন অংশে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে মৎস্য প্রজেক্ট করেছেন। এমনকি সেখানে পাকা ও টিনের বসতঘর নির্মাণ করে অনেক রোহিঙ্গা পরিবারকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা গেছে।

ছদাহা ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বন গবেষণা কেন্দ্রের জায়গা খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বেশ কিছু জায়গা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এর পর পরই বনভূমি দখলের প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। দখল হওয়া অধিকাংশ জায়গায় ফলদ বাগান, বসতঘর ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। মূলত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখল কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে।

পূর্ব ছদাহাসংলগ্ন দক্ষিণ মাহালিয়া গ্রামের যুবক তানজিমুল ইসলাম বলেন, ‘বনভূমি দখলের পরিধি বৃদ্ধি পেলেও উদ্ধারের কার্যক্রম তেমন একটা নেই বললেই চলে। এখানে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে দখলদারদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জায়গা কিনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এমনকি পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করা অনেক রোহিঙ্গা মাদক, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের স্টেশন কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) আনিছুর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দুই হেক্টর বনভূমি দখলমুক্ত করে মিক্সড প্ল্যান্টেশন প্রকল্পের অধীনে আট প্রজাতির চারা রোপণ করা হয়েছে। বিএস রেকর্ড সংশোধনের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর পরই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মিজান-উল-হক বলেন, ‘সম্প্রতি আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কেন্দ্রটি বেশ কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। সেখানে দ্রুত উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.