চকরিয়ায় ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা: ছেলে-মেয়ে ও পুত্রবধূসহ গ্রেফতার ৪

 

মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন

কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় ছেলের বাসায় ছুরিকাঘাতে খুনের শিকার হয়েছেন আরফা (৭৫) নামের এক বৃদ্ধা নারী।
অভিযোগ উঠেছে, হত্যার ঘটনায় নিজের ছেলে, ছেলের বউসহ পরিবারের লোকজন জড়িত থাকায় সেসময় ঘটনাটি নিয়ে ছেলে মেয়ে কেউ আইন আদালতের আশ্রয় নেয়নি। একপর্যায়ে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছিল।
এ অবস্থায় বৃদ্ধা নানির মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় নাতি (নিহতের মেয়ে জান্নাত আরা বেগমের ছেলে) মোঃ পারভেজ উদ্দিনের মনে।

এরই প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ তারিখে নাতি পারভেজ উদ্দিন বাবু (২৯) বাদী হয়ে চারজনের নামোল্লেখ করে আরও ৩-৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার বাদী পারভেজ উদ্দিন চকরিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড পালাকাটা হাশেম মাস্টার পাড়ার
রশিদ আহমদের।অন্যদিকে মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন হাফেজ টাওয়ার বিল্ডিংয়ের মালিক নিহতের ছেলে শামসুল আলমের স্ত্রী নাছরিন সোলতানা মুন্না (২৮), বাসার গৃহকর্মী লামা উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের হারগাছা এলাকার বাসিন্দা জয়নাব বেগম (২২), নিহতের ছোট ছেলে আবদুল আজিজ (৩৫) ও তাঁর স্ত্রী আকলিমা জান্নাত (২৬)।

মামলার এজাহারে বাদি উল্লেখ্য করেছেন, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বিকাল তিনটা থেকে পরদিন ১১ নভেম্বর সকাল ছয়টার মধ্যবর্তী সময়ে বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ এলাকার হাফেজ টাওয়ার নামক বিল্ডিং এর ২য় তলায় ছেলের বাসায় নিজের ছেলে আবদুল আজিজ এবং দুই ছেলের স্ত্রীসহ কতিপয় দুবৃর্ত্তরা মিলে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। ছুরিকাঘাতে আরফা খাতুনের পেটের নাড়িভুড়ি বের হয়ে যায়।

বাদি এজাহারে বলেন, আরফা খাতুন নিজ নামীয় ৬৫ কড়া ভুসম্পত্তি মেয়ে লায়লা বেগমের নামে এককভাবে হেবা করে দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে আসামিরা (ছেলে এবং দুই ছেলের স্ত্রী মিলে) কৌশলে বাসায় বেড়াতে এনে বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। ঘটনার পর এজাহারনামীয় আসামিরা উল্টো নাটক সাজিয়ে বৃদ্ধা আরফা খাতুন ছেলেদের বাসায় বেড়াতে এসে আত্মহত্যা করেছে জানিয়ে তাঁর মরদেহ তড়িঘড়ি করে গ্রামের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা নিয়ে গিয়ে বিনা ময়নাতদন্তে দাফন করে। এরপর তাঁরা ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়।

মামলার বাদিপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট ওমর ফারুক বলেন, আদালত বাদির ফৌজদারি নালিশী মামলাটি আমলে নিয়ে এবিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে রিপোর্ট দাখিল করতে চকরিয়া থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে চকরিয়া থানা পুলিশ বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে হত্যার ঘটনায় উল্লেখিত সময়ে চকরিয়া থানায় কোনধরণের মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং অভিযোগ কেউ দাখিল করেননি বলে আদালতে রিপোর্ট সহকারে জানান।

মামলার প্রাথমিক শুনানীতে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই তারিখে আদালতের বিচারক মুহাম্মদ ফারহান সাদিক পুনরায় মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পুলিশ কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আদালত তদন্তকালে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রতিয়মান হলে তাদেরকে গ্রেফতারে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দেন।

আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, পিবিআই পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব পোদ্দার মামলাটি তদন্তকালে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন এবং জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে হত্যার ঘটনায় এজাহারনামীয় চার আসামির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর তারিখে এজাহারনামীয় চার আসামির মধ্যে নাছরিন সোলতানা মুন্না, জয়নাব বেগম ও আবদুল আজিজকে আটক করে আদালতে সৌপদ্দ করেন।

এসময় মামলার দুইজন স্বাক্ষী নিহতের মেয়ে জান্নাত আরা বেগম ও নিহতের ভাতিজার স্ত্রী হামিদা বেগম এজাহারনামীয় আসামিরা সম্পত্তির জন্য বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে হত্যা করেছে মর্মে স্বাক্ষী হিসেবে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেন।

এরপর আদালতের বিচারক মুহাম্মদ ফারহান সাদিক আটক তিন আসামি যথাক্রমে নিহতের ছেলে আবদুল আজিজ, অপর ছেলের স্ত্রী নাছরিন সোলতানা মুন্না এবং তাদের সহযোগী বাসার গৃহকর্মী জয়নাব বেগমকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কক্সবাজার পিবিআই পুলিশের এসআই রাজীব পোদ্দার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এজাহারনামীয় চার আসামি বৃদ্ধা আরফা খাতুনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে। নিহতের মেয়েসহ দুইজন স্বাক্ষী আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, এজাহারনামীয় চার আসামির মধ্যে আকলিমা জান্নাত পলাতক রয়েছেন। তাঁকে ধরতে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আটককৃত তিনজনের বিরুদ্ধে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকালে চকরিয়া রিপোর্টাস ইউনিটি কার্যালয়ে এসে মামলার বাদি পারভেজ উদ্দিন অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে চার আসামির মধ্যে তিনজন গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে গেলেও পলাতক এজাহারনামীয় আসামি আকলিমা জান্নাতসহ অন্য আসামিরা নানাভাবে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছে।

এরই জেরধরে চকরিয়া পৌরসভার একজন সাবেক কাউন্সিলর (বিএনপি নেতা) আসামির মধ্যে একজন তাঁর নিকটাত্মীয় হবার সুবাদে তাকে বাচাঁতে নানামুখী কুটচাল শুরু করেছেন।ইতোমধ্যে ওই বিএনপি নেতা মামলাটি তুলে নিতে নানাভাবে হুমকি ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে অপহরণ করে হত্যা করে লাশ গুম করবে এমন হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মামলার বাদী। এমন পরিস্থিতিতে বাদি পারভেজ উদ্দিন এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও দাবি করেছেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.