মদ খেয়ে প্রকাশ্যে মাতলামির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দিলেও- ডোপ টেষ্টে মিলেনি প্রমাণ

৩ পুলিশের প্রকাশ্য ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবী সেই যুবকের -

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মাদক সেবন করে প্রকাশ্যে মাতলামির অভিযোগে সাত দিনের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো এক যুবকের ডোপ টেস্টে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর করা ওই পরীক্ষার প্রতিবেদনের পর ১৬ সেপ্টেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালতে দেওয়া সাজা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন।

আলাউদ্দিনের অভিযোগ, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মৌলভীর দোকান এলাকা থেকে তাঁকে সাতকানিয়া থানার এএসআই মতিন, এএসআই নুরুদ্দীন ও কনস্টেবল মোজাম্মেল আটক করেন। পরে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাদক সেবন করে মাতলামির অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়।

আলাউদ্দিনের দাবি, তাঁকে আটকের সময় ঘটনাস্থলে কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন না। মাদক সেবনের অভিযোগের সমর্থনে কোনো ডোপ টেস্টের প্রতিবেদনও তাঁকে সাজা দেওয়ার সময় দেখানো হয়নি। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার নথিতেও ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

ভুক্তভোগী আলাউদ্দিনের অভিযোগ, ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে কালিয়াইশের মৌলভীর দোকান এলাকা থেকে তিন পুলিশ সদস্য তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। পরদিন ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদক সেবন করে মাতলামির অভিযোগে তাঁকে সাত দিনের সাজা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, সাজার আগে কোনো ডোপ টেস্ট করা হয়নি এবং সাজার নথিতেও এর কোনো প্রতিবেদন নেই। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর নিজ উদ্যোগে ডোপ টেস্ট করালে ফলাফল নেগেটিভ আসে। এতে মাদক সেবনের অভিযোগে দেওয়া তাঁর সাজা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেন আলাউদ্দিন।

পরে সাজা ভোগ করে কারাগার থেকে বের হয়ে আলাউদ্দিন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো মাদক সেবন করেননি। এর সমর্থনে তিনি চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্রও দাখিল করেছেন বলে জানান।

আলাউদ্দিনের লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, তাঁকে আটকের সময় ওই তিন পুলিশ সদস্য তাঁর কাছে কয়েকটি ইয়াবা ও গাঁজা গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে স্থানীয় লোকজন ঘটনাটি ভিডিও করায় পুলিশ সদস্যরা তা করতে পারেননি বলে অভিযোগ তাঁর।

আলাউদ্দিনের দাবি, সাজা ভোগ করে কারাগার থেকে বের হয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর করা ডোপ টেস্টে তাঁর শরীরে মাদকের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে।

এ সংক্রান্ত একটি মেডিকেল রিপোর্ট ও বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া অভিযোগের কপি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২৪(৪) ধারায় বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি শনাক্ত করার প্রয়োজনে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট করা যেতে পারে। ডোপ টেস্ট পজিটিভ হলে আইনের ৩৬(৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

একই আইনের ২৪(২) ও ২৪(৩)-এ দেহ পরীক্ষায় মাদকদ্রব্যের উপস্থিতি কিংবা মাদক গ্রহণ, সেবন, ব্যবহার বা প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেই মাদক অপরাধের বিচার সাধারণত এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের মাধ্যমে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই আইনের ৫৭ ধারায় অবশ্য মাদকদ্রব্য অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর অধীনেও বিচার করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কোনো তফসিলভুক্ত অপরাধ সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে নিয়ে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দণ্ড দিতে পারেন।

এ কারণে আলাউদ্দিনকে কোথায়, কখন এবং কীভাবে আটক করা হয়েছিল, আটকের সময় কী আলামত পাওয়া গিয়েছিল, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কী উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং সাজার নথিতে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি কীভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

আইনের ২১ ধারায় প্রকাশ্য স্থানে মাদক অপরাধের সন্দেহে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আটক ও তল্লাশির ক্ষমতা রয়েছে। তবে ২২ ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, আটক ও বাজেয়াপ্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণ করতে হবে।

ফলে শুধু পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যের ভিত্তিতে একজনকে আটক করার পাশাপাশি পরবর্তী ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে কী কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনজীবীরা বলছেন, মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা সাধারণ ফৌজদারি আদালতের বিকল্প নয়। মোবাইল কোর্ট আইনের ৬ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে বিচার করার কথা বলা হয়েছে।

ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন জানান, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে কালিয়াইশের মৌলভীর দোকান এলাকা থেকে তিন পুলিশ সদস্য তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। পরদিন ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদক সেবন করে মাতলামির অভিযোগে তাঁকে সাত দিনের সাজা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, সাজার আগে কোনো ডোপ টেস্ট করা হয়নি এবং সাজার নথিতেও এর কোনো প্রতিবেদন নেই। পরে সাজা ভোগ করে কারাগার থেকে বের হয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর নিজ উদ্যোগে ডোপ টেস্ট করালে ফলাফল নেগেটিভ আসে। এতে মাদক সেবনের অভিযোগে দেওয়া তাঁর সাজা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আলাউদ্দিন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য এএসআই মতিন আলাউদ্দিনকে আটকের কথা স্বীকার করেন। আটকের সময় তার কাছে কি পাওয়া গিয়েছিল জানতে চাইলে তিনি জানান, আলাউদ্দিনের কাছ থেকে ইয়াবা পাওয়া গিয়েছিল।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়াবা পাওয়া গেলে কেনই বা ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয় গাঁজা খেয়ে মাতলামি ও অসদাচরণ করার অভিযোগে। আলাউদ্দিনের কাছে থাকা ইয়াবা গুলো তাহলে গেল কোথায়?জব্দ তালিকায় ইয়াবা কিংবা গাঁজা পাওয়া গেছে এরকম কোন তথ্য কেন নেই?সাজাতেও কেন ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য নেই?

বিষয়টি জানতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সাজা দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব দাশ পুরকায়স্থকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়,

২০১৯ সালের ২০ আগস্ট চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমী জেলার সব থানার অফিসার ইনচার্জদের সতর্ক করে একটি আদেশ জারি করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন- ওসিরা আটককৃত আসামিদের নিয়মিত আদালতে সোপর্দ না করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ইউএনও বা এসিল্যান্ডের সামনে উপস্থাপন করছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এর বিধান লঙ্ঘন করে আসামিদের আইনবহির্ভূতভাবে সাজা প্রদান করছেন। যা দেশের সংবিধান ও প্রচলিত অন্যান্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ওই আদেশে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে যে, পুলিশ কর্তৃক আটককৃত আসামিদের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের সিদ্ধান্ত মান্য না করে আইনবহির্ভূত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সহায়তা করার কোনো সংবাদ আদালতের গোচরীভূত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের কারণে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.