আমদানি স্বাভাবিক, তবু বাড়ছে ছোলার দাম; কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা

ডেস্ক রিপোর্ট 

আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও দেশের বাজারে হঠাৎ বেড়ে গেছে ছোলার দাম। ফলে রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা পণ্যটির কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণত রমজানে ছোলার চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার জুলাই ও আগস্টে দেশে বেশি পরিমাণে ছোলা আমদানি হয়েছে। তা সত্ত্বেও গত দুই মাসে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ছোলার দাম কেজিতে ১৭ থেকে ২১ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, অস্ট্রেলিয়ায় ছোলার উৎপাদন কমায় আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বেড়েছে। এ কারণে দেশের বাজারেও দাম বাড়ছে।

তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরেও সরবরাহ সংকটের কথা বলে মূল্যবৃদ্ধিকে রমজানের আগে অগ্রিম দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন ভোক্তারা।

ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, বাজারে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজির সুযোগ পেয়ে রোজার আগেই ধাপে ধাপে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ছোলার দাম প্রতি মণ (৩৭.৩২ কেজি) ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খাতুনগঞ্জের ছোলা ব্যবসায়ী ও ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ দে টিবিএসকে বলেন, গত দুই মাসে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছোলা আমদানির বুকিং দর ক্রমাগত বেড়েছে।

‘একপর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার ছোলার বুকিং দর টনপ্রতি ৮৫০ ডলারে উঠেছিল। বর্তমানে তা কিছুটা কমে ৮২০ থেকে ৮৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে। আগে টনপ্রতি ৬৫০ থেকে ৬৮০ ডলারে ছোলা বুকিং দেওয়া যেত,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কম দামের আগের চালানগুলো ছিল আগের বছরের। বর্তমানে বাজারে মূলত ওই পুরোনো ছোলা রয়েছে। নতুন মৌসুমের ছোলা বাজারে আসতে শুরু করলে দাম কমে আসতে পারে।’

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাব বর্তমানে দেশের বাজারে পড়লেও ভারত থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে দামের এই চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

এদিকে গত সপ্তাহে ঢাকার খিলগাঁও কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

রমজানের অনেক আগেই বেড়েছে আমদানি

চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছোলা আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন।

২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১৭ হাজার ১৭৭ টন। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৮১ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ দুই মাসে আমদানি বেড়েছে ১৫ হাজার ৭৯৬ টন।

২০২৬ সালে রমজান শুরু হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওই রমজানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৯২ টন। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আমদানি হয়েছে ৭৯ হাজার ৭৭১ মেট্রিক টন।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে ছোলার চাহিদা গড়ে ১০-১২ হাজার টন। তবে রমজান মাসে এই চাহিদা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টনে গিয়ে দাঁড়াই। এই হিসাবে, দেশে ছোলার বার্ষিক চাহিদা ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টন।

দাম বাড়ানোর পেছনে কৃত্রিম সংকট বা কোনো সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বাজারের মজুত, আমদানিকারকদের বিক্রির তথ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।

তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। মূলত বাজার তদারকির অভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছোলার চাহিদা কত, আমদানি কত হচ্ছে, আমদানি খরচ কত পড়ছে এবং কী দামে বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারকে মুক্ত করা কঠিন হবে।

‘এভাবে দাম বাড়তে থাকলে রমজান পর্যন্ত তা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদনের পূর্বাভাস

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম এবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার কৃষি, পানি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণা ও অর্থনীতি ব্যুরো ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশটিতে ছোলার উৎপাদন ৫২ শতাংশ কমে ১০ লাখ টনের সামান্য বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

ছোলা চাষের জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং দেশটির প্রধান উৎপাদন অঞ্চল নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তরাঞ্চল ও কুইন্সল্যান্ডে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা থেকে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, উৎপাদন কমার এই পূর্বাভাসও অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে। প্রকৃত উৎপাদন আরও কম হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার প্রভাবও ছোলার বাজারে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ছোলার দাম টনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা বছরের শুরুর দিকে প্রায় ৬০০ ডলার ছিল। তবে ফসল তোলার পর নতুন ছোলার সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসতে পারে।

চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ছোলার বুকিং রেট বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। তবে বর্তমানে ছোলার সরবরাহে বড় ধরনের সংকট নেই।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ বলেন, ছোলার মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যাচাই করে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.