সাজেক ঘিরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ,চলছে নিয়ন্ত্রণের লড়াই-থমকে গেছে পর্যটন অর্থনীতি
অস্থিরতার পেছনে ইন্ধন থাকতে পারে তৃতীয় পক্ষের কেউ-
সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম থেকে
একসময় পাহাড়ের মেঘ, সবুজ বন আর সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত সাজেক। রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ, দোকান ও জিপ পরিবহন ঘিরে গড়ে উঠেছিল কয়েক কোটি টাকার পর্যটন অর্থনীতি। কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ, অবরোধ ও নিরাপত্তাহীনতায় এখন পর্যটকশূন্য মেঘের রাজ্য। বন্ধের মুখে পর্যটন ব্যবসা, অনিশ্চয়তায় হাজারো মানুষের জীবিকা। সাজেকের এই সংকট শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্রের অচলাবস্থা নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত পর্যটনকেন্দ্রটিতে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতার পাহাড়ি জনপদটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদেরও আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা রাখে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে সেখানে ছোট-বড় ১৫৩টি রিসোর্ট ও কটেজ, ১৯টি রেস্তোরাঁ এবং প্রায় ৭০টি দোকান গড়ে উঠেছে। সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক জিপ চলাচল করত। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, সাজেকে দৈনিক কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হতো। অবরোধে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজেকে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরোধ নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শনিবার ও রোববার পৃথক এলাকায় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহতের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ কর্মসূচি শিথিলের ঘোষণা থাকলেও পাল্টা কর্মসূচির কারণে স্বাভাবিক যান চলাচল ফেরেনি। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ দফা দাবিতে ১১ দিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ রোববার সকাল-সন্ধ্যা শিথিল করে। একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির ব্যানারে আরেকটি সংগঠন পাল্টা অবরোধের ডাক দেয়। ফলে কয়েকটি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চলাচল করলেও অন্য যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। সোমবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার সাজেকের মাচলং এলাকার কলাবুনিয়া ও ভাঙামুড়া এবং রোববার ঝুরঝুরি ছড়ার লাঙ্গলমারা এলাকায় দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। তবে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে জেএসএস ও ইউপিডিএফ উভয় পক্ষ।
ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, তাদের কেউ এ ধরনের গোলাগুলিতে জড়িত নন। একইভাবে জেএসএসের কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমাও তাঁদের দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, লাঙ্গলমারা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এর আগে ১১ অক্টোবর অবরোধের প্রথম দফা শুরু হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত হলেও দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ শুরু হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত ছিল। পরে ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ২২ অক্টোবর থেকে সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
গত ২৬ অক্টোবর সাজেকের উজো বাজারে অবরোধকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সাজেক থেকে পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ঐকমত্য হয়নি। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার হয়নি। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধ সংগ্রহেও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুইলুই এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বহু স্থাপনা পুড়ে যায়। সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির হিসাবে, এতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৩৪টি রিসোর্ট, সাতটি রেস্তোরাঁ, ১৮টি দোকান ও ৩৬টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই অবরোধ ও নিরাপত্তা সংকট তাঁদের নতুন করে বিপাকে ফেলেছে।
এ প্রেক্ষাপটে সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণা দেব বর্মণ বলেন, জুলাই থেকে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও সেপ্টেম্বর থেকে মূলত পর্যটকের চাপ বাড়ে। সেপ্টেম্বরের পর থেকে শীতকাল পর্যন্ত সাজেকে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি থাকে। এ সময় রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় বুকিং বাড়ে। ব্যবসায়ীদের সারা বছরের আয়-ব্যয়ের বড় অংশ নির্ভর করে এই মৌসুমের ওপর। কিন্তু পর্যটন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অবরোধ শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, অবরোধের কারণে রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ খাতে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। তবে এই হিসাব শুধু রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর। এর বাইরে জিপচালক, পরিবহন মালিক, দোকানি, স্থানীয় সবজি বিক্রেতা, হস্তশিল্পের কারিগর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ এতে যুক্ত হয়নি। পর্যটক না এলে রিসোর্টে কর্মরত কর্মচারীদের কাজ থাকে না, রেস্তোরাঁয় খাবার বিক্রি হয় না, দোকানপাটে বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়। পর্যটনকে ঘিরে যাঁরা আয় করেন, তাদের প্রত্যেকের জীবিকায় এর প্রভাব পড়ছে। ২০২৫ সালের অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের ক্ষতির পর ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। নতুন করে রিসোর্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই অবরোধ শুরু হওয়ায় আবারও আর্থিক সংকটে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
সভাপতি বলেন, পর্যটন মৌসুমে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে কর্মচারীদের বেতন, প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। সাজেকের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে শুধু রিসোর্ট মালিকদের ব্যবসা জড়িত নয়। পর্যটকদের যাতায়াত, খাবার, কেনাকাটা ও বিনোদনকে কেন্দ্র করে একটি বড় স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। পর্যটক বন্ধ থাকলে এই অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ক্ষতি হয়। তাই পর্যটন চালু রাখতে সবার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আগের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা ব্যবসায়ীদের নতুন করে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
সাজেকের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অংশ জিপ পরিবহন। পর্যটকদের যাতায়াতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের পণ্য পরিবহনেও এসব যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের নামে গাড়িপ্রতি বছরে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত টোকেন বা চাঁদা দিতে হয়।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন জিপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর হোসেন জানান,’চারটি সংগঠনের নামে গাড়িপ্রতি বছরে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত টোকেন আদায় করা হয় চালকদের থেকে । টাকা না দিলে চালকদের মারধর কিংবা গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে চালকেরা অনেকটা জিম্মি অবস্থায় গাড়ি চালান। সাজেকে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত না হলে পরিবহন ব্যবসাও টিকবে না। পাহাড়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকেরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারলে চালকদের আয় হবে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা বাড়বে। কিন্তু সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগের মধ্যে চালকেরা স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে পারছেন না। অবরোধে শুধু পর্যটন ব্যবসায়ী নয়, পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
সাজেকের দোকানি মামুন বলেন,’পর্যটক না থাকলে দোকান চলে না। রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, জিপচালক কিংবা দোকানি সবাই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন বন্ধ থাকলে সবার আয় বন্ধ হয়ে যায়। সমস্যাকে শুধু বাঙালিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে প্রকৃত সংকট আড়ালে চলে যাবে। চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে এ অবস্থার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।’
সাজেকের পর্যটন সম্ভাবনা শুধু স্থানীয় পর্যটকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করারও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বারবার অবরোধ, চাঁদাবাজির অভিযোগ ও গোলাগুলির ঘটনায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
তরুণ রিসোর্ট উদ্যোক্তা শাহরিয়ার আমিন বলেন, পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে হলে ভালো রিসোর্ট, মানসম্মত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করতে পারে। নেপাল, ভুটান কিংবা কাশ্মীরের মতো পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করার মতো সম্ভাবনা রয়েছে এ অঞ্চলে। কিন্তু একাধিক পক্ষের চাঁদা দাবি, নিরাপত্তাহীনতা, অবরোধ ও গোলাগুলির কারণে নতুন করে বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আজ রিসোর্ট তৈরি করে কাল অবরোধ বা গোলাগুলির কারণে পর্যটক না এলে বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখা কঠিন। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
নভেম্বর মাসে সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন নবদম্পতি আনোয়ার ও রিপা চৌধুরী। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তাদের বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। আনোয়ার ও রিপা বলেন, সাজেকসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। নিজেদের ঘরেই যদি সমস্যা থাকে, তাহলে পর্যটকেরা সেখানে যাবেন কীভাবে? নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে মানুষ ভ্রমণে আগ্রহ হারাবে।
সাজেকের চলমান অস্থিরতার পেছনে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,আগে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় অন্য একটি পক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে। এখন আগের পক্ষটি সরকারি বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু একটি পক্ষকে সরিয়ে অন্য পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। এতে বিরোধ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাজেক এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। পাহাড়ে বিভিন্ন এলাকাতেও একাধিক সংগঠনের উপস্থিতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব বিরোধের মধ্যে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চাপে পড়ছেন।’
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-মূল), পিসিজেএসএস (সংস্কার), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং সাম্প্রতিক সময়ে আত্মপ্রকাশ করা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও মগ লিবারেশন পার্টির (এমএলপি) নাম বিভিন্ন সময় সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এসেছে।
সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা গণমাধ্যমকে বলেন, সাজেকে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের হাতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের হয়রানি আড়াল করতেই এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পিসিজেএসএস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও পর্যটন ব্যবসা পুনরায় চালু করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে আতঙ্কে ব্যবসা-বাণিজ্য
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। জুম চাষের ফসল, কৃষিপণ্য, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী, হোটেল-মোটেল, পর্যটন রিসোর্টসহ বিভিন্ন ব্যবসা থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। কোনো কোনো এলাকায় পণ্য পরিবহনের পথ, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
শুধু স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন, বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করা প্রকৌশলী, চালক, শ্রমিক এবং পর্যটকেরাও বিভিন্ন সময়ে অপহরণের শিকার হন। বিশেষ করে বান্দরবানের রুমা ও থানচিসহ দুর্গম এলাকায় সড়ক নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনার কারণে দুর্গম এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, পণ্য পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
যে অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনার আগে চাঁদা দাবি, অপহরণ কিংবা সশস্ত্র হামলার আশঙ্কা বিবেচনায় নিতে হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারখানা, পর্যটন রিসোর্ট কিংবা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে জমি, অবকাঠামো ও মূলধনের পাশাপাশি কর্মী ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রয়োজন। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা জাতীয় পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চান না। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় মানবাধিকার কর্মীরা।
বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। পাহাড়, বন, নদী, কৃষি, ফল, বাঁশ-বেত, হস্তশিল্প ও পর্যটনকে ঘিরে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিকাশের বড় সুযোগ রয়েছে। সাজেক ছাড়াও তিন জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, পাহাড়ি কৃষিপণ্য, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, হস্তশিল্প ও পরিবহন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা, চাঁদাবাজির অভিযোগ, অপহরণ ও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সমতলের শিল্প উদ্যোক্তারা পাহাড়ে কারখানা, আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট কিংবা কর্মসংস্থানমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে কর্মী ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করেন। ফলে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলে বড় বিনিয়োগের প্রবাহ সীমিত থাকছে। বিনিয়োগ না এলে শিল্প গড়ে ওঠে না, কর্মসংস্থান বাড়ে না, স্থানীয় তরুণদের জন্য বিকল্প আয়ের পথও তৈরি হয় না।
পাহাড়ে উৎপাদিত ফল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বাঁশ-বেত ও স্থানীয় হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। পর্যটন অবকাঠামো উন্নত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু নিরাপদ যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন পণ্য পরিবহন ও ব্যবসার নিশ্চয়তা না থাকলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন।
দুর্গম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের শঙ্কা
মানবাধিকারকর্মী আজম খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সীমান্তের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তিন পার্বত্য জেলার বিস্তৃত ও দুর্গম সীমান্তের কিছু অংশে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে নজরদারি ও টহল পরিচালনা কঠিন। এসব সীমান্তপথ ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য চোরাচালানি পণ্য প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) আরও আধুনিক ও সক্ষম করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দুর্গম সীমান্ত পয়েন্টে প্রয়োজন অনুযায়ী বিজিবি ক্যাম্প ও বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) বাড়ানো, ড্রোন প্রযুক্তি, নাইট ভিশন যন্ত্র ও আধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম ব্যবহার করা গেলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভূপ্রকৃতিতে নিরাপত্তা রক্ষা ও সশস্ত্র অপরাধ দমনে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। তবে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা, অপরাধী শনাক্ত, অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেপ্তার এবং মামলার তদন্তে বাহিনীগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তা অভিযানের ক্ষেত্রে আইনগত এখতিয়ার, দায়িত্বের সীমা ও বিচারিক প্রক্রিয়া স্পষ্ট না থাকলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হতে পারে বলে জানান মানবাধিকারকর্মী আজম খান।
শান্তিচুক্তির পরও স্থায়ী নিরাপত্তার প্রশ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক হতে চললেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এখনো আলোচনায়। চুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধ, আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা পক্ষের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিরোধের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এ লক্ষ্যে জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান সময়সাপেক্ষ। পর্যটন ও সাধারণ মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কর্মসূচি থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরত থাকা উচিত। প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
সাজেকের পর্যটন বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেই কোনো অঞ্চল এগিয়ে যায় না। নিরাপদ যাতায়াত, ব্যবসার নিশ্চয়তা, কর্মীদের সুরক্ষা ও স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া পর্যটন কিংবা শিল্পায়ন টেকসই হয় না। অবরোধের কারণে সাজেকের রিসোর্ট মালিক, জিপচালক, দোকানি ও কর্মচারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।