নিজস্ব প্রতিবেদক: বিতর্কিত ‘রান বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনকে ম্যারাথন প্রতিযোগিতার অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন স্থানে ম্যারাথন আয়োজনের নামে বিশৃঙখলা সৃষ্টির দায়ে তাদের ম্যারাথন আয়োজন বাতিল করেছিল স্থানীয় রানা’র কমিউনিটি। আর্থিক ও পুরস্কার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে। অবশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে থাকা এসব অভিযোগের বিষয়টি অবহিত নয়।
এছাড়া ম্যারাথনের আন্তর্জাতিক মনিটরিং সংস্থাকে এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন এন্ড ডিস্টেন্স রেসেসকে (এইমস) মিথ্যা তথ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যারাথন আয়োজনের স্বীকৃতি আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এই সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরণের স্বীকৃতি পেতে একই ভেন্যুতে আগে দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিপূর্বে সীমিত আকারেও এই ধরণের কোন আয়োজন করেনি রান বাংলাদেশ।
রোববার (১২ ফেব্রুয়ারী) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হলো নিয়মিত দৌঁড়। তাই বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ম্যারাথনের জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশেও ম্যারাথনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বেশ। বিগত কয়েক বছরে দেশের নানা প্রান্তে প্রতি সপ্তাহে চলতে থাকা বিভিন্ন দৌড় প্রতিযোগিতাই এর প্রমাণ। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো যেখানে ম্যারাথনকে জনপ্রিয় করতে এই আয়োজন করছে, সেখানে কতিপয় ব্যবসায়ী একে পুঁজি করে শুরু করেছে বাণিজ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারী রান বাংলাদেশের উদ্যোগে ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সংগঠনকে অনুমতিও দিয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ম্যারাথন আয়োজনের বিষয়ে কোনো ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ করেনি। নেওয়া হয়নি রান বাংলাদেশ সংগঠনের সিইও ও ম্যারাথনের আয়োজক সাজনান মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগের প্রাক্তনও শিক্ষার্থীও নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন যে খেলার পালে হাওয়া লাগে সেদিকেই ‘নৌকা চালানো’ এই সাজনান মোহাম্মদ সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ‘রেস বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনটির ব্যানারে আয়োজন করতো সাইক্লিং প্রতিযোগিতা।
সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তায় ভাটা পরার পর ম্যারাথনের জোয়ার সৃষ্টি হওয়াতে রেস বাংলাদেশ থেকে এটি হয়ে যায় ‘রান বাংলাদেশ’। ২০২১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া এলাকায় হাফ ম্যারাথন আয়োজনের নামে রেজিস্ট্রেশন আহবান করে। কিন্তু সংগঠনটির অতীতের বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে নেতিবাচক বিষয় উঠে আসায় স্থানীয় জনরোষের কারণে প্রশাসন এ আয়োজনের অনুমতি দেয়নি। পরে আখাউড়া থেকে একপ্রকার বিতারিত হওয়ার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপজেলা সদরে রান বাংলাদেশ ম্যারাথন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেখানেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ম্যারাথন সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় রান বাংলাদেশ।
শুরুর স্থানে প্রত্যাখ্যাত হয়েও থেমে থাকেনি রান বাংলাদেশ। তার দৃষ্টি গিয়ে পরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত চট্টগ্রামে। গত নভেম্বর মাসেই সাতকানিয়ায় আয়োজন করে ‘চট্টগ্রাম ট্রেইল হাফ ম্যারাথন’ নামক প্রতিযোগিতা। বাজারে প্রচলিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে শুভেচ্ছা ফি নিয়ে ও বেশ বড়সড় প্রতিষ্ঠান স্পন্সর হিসেবে যুক্ত হবার পরও সে ব্যয় সংকুলান না হওয়ার অযুহাতে পুরুষদের নিয়মানুযায়ী পুরষ্কৃত করলেও নারীদের মাঝে পুরষ্কার দেয় একজনকে। যা ম্যারাথন প্রতিযোগিতার নৈতিকতা বিবর্জিত কান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী ৩ জন পুরুষকে পুরস্কৃত করলে ৩ জন নারীকেও পুরস্কৃত করার চর্চা রয়েছে এ ধরণের আয়োজনে। কিন্তু রান বাংলাদেশ লাখ লাখ টাকার স্পনসর নিয়েও নারী ক্যাটাগরিতে শুধুমাত্র একজনকে পুরস্কার দিয়ে দায় সেরেছে বলে অভিযোগ উঠে।
পাঁচ শতাধিক দৌঁড়বিদদের অংশগ্রহণে আয়োজন ‘চট্টগ্রাম সিটি হাফ ম্যারাথন ২০২২’ এ সে চীন থেকে মেডেল সরবরাহ করার কাজ হাতে নেয়। সরবরাহ নিশ্চিত করতে আয়োজনের আগে অগ্রিম অর্থ নেয়। অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে মেডেল দেশে চলে এসেছে বলে আয়োজকদের রান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু তারা ম্যারাথন আয়োজনের দিন জানায়, মেডেল তখনো দেশেই পৌঁছেনি। এ ঘটনার কারণে অনুষ্ঠানের দিন আয়োজকদের হেনস্তা হতে হয়। ব্যবস্থাপনাতে এতো দূর্বলতা স্বত্তেও রান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ‘ঢাকা ২৫কে’ এবং ‘সিলেট ২৫কে’ প্রতিযোগিতা আয়োজনের ঘোষণা দেয়। ইভেন্ট ঠিকঠাক শেষ করতে না পারার কারণে ব্যাপক বিশৃংখলা হয় রান বাংলাদেশের ম্যারথন আয়োজনে। এ কারণে এই সংগঠনটিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ম্যারাথন আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবুও বিভিন্ন ইভেন্ট ঘোষণা দিয়ে বড় অংকের টাকা রেজিস্ট্রেশন বাবদ নিচ্ছে সংগঠনটি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে রান বাংলাদেশের উদ্যোগে কোনো ম্যারাথন আয়োজন হয়নি। কিন্তু ম্যারাথন আয়োজনে আন্তর্জাতিক ম্যারাথন মনিটরিং সংস্থাকে এইমসকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ম্যারাথন আয়োজনের স্বীকৃতি নেয়।
অতএব মহোদয়ের নিকট বিনীত নিবেদন, বিতর্কিত সংগঠন রান বাংলাদেশে’র মত অপেশাদার সংগঠনের উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্থানে ম্যারাথন আয়োজন করলে ম্যারাথান প্রোগ্রাম নিয়ে বিশৃংখলা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটির এই বাণিজ্যিক কর্মসূচির অনুমতি বাতিল করে বাধিত করবেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় রান বাংলাদেশের স্বত্ত্বাধিকারী সাজনান আহমেদের সঙ্গে। তিনি চট্টগ্রাম সংবাদকে বলেন, ‘করোনার কারণে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ইভেন্ট করতে পারিনি। আখাউরাতে আমরা প্রথম ইভেন্ট করেছি। যেটা সময়টিভি কাভারও করেছে। কিন্তু আখাউড়ায় দ্বিতীয় ইভেন্টটি হয়নি রাজনৈতিক কারণে। আখাউড়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ টাকা চেয়েছিল। আমরা তাদের টাকা দিইনি। পরে প্রোগ্রামটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রান্সফার হলো। আগে থেকেই ম্যারাথন স্পটে প্রোগ্রাম করার অভিজ্ঞতা থাকার নিয়ম আছে কি-না আমাদের জানা নেই।’
সাজনান আহমেদ এ সময় প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি বঙ্গবন্ধু ম্যারাথন আয়োজকদের কল দিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন। যেটা আর্মিরা অরগানাইজ করেছে। তাদের প্রথম ইভেন্টে কীভাবে এইমএস এসেছিল? ওরাও প্রথমবার এইমস পেয়েছে, আমিও প্রথমবার এইমস পেলাম।’
আর্মি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে ম্যারাথন আয়োজনে এইমস স্বীকৃতি দিতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোনো স্পটে প্রথম ম্যারাথন আয়োজনে এইমস স্বীকৃতি দিতে পারে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে সাজনান আহমেদ বলেন, ‘ওদেরটা ম্যারাথন ইভেন্ট, এটা কি ম্যারাথন ইভেন্ট না? আর্মিকে দিবে আর আমাকে দিবে না এটা কোথাও লিখা আছে?’ একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।