চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদের মৃত্যুর পর কে হচ্ছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি? এই নিয়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ বিশেষ করে দক্ষিণ জেলার নেতাকর্মীদের মাঝে নানা গুঞ্জন ছিল। মোসলেম উদ্দিনের শোক কেটে উঠতে না উঠতেই গত কিছু দিন ধরে এই বিষয়টি ছিল ‘টক অব দ্যা চট্টগ্রাম’। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর সম্নেলনের মাধ্যমে পুন: মোছলেম উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও মফিজুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর পরের সপ্তাহে গত দুই বছর আগে থেকেই শরীরে শুরু হওয়া ক্যান্সারের ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন মোছলেম উদ্দিন। সেখানে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসা শেষে গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মৃত্যুবরণ করেন চট্টগ্রামের বরেণ্য এ আওয়ামী লীগ নেতা। মূলত এর পর থেকেই দক্ষিণ জেলায় আওয়ামী লীগের কমিটিতে মোছলেম উদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন ঘুরেফিরে সেই প্রশ্নই ছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ছাত্রলীগ সহ সকলের মুখে মুখে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় , মৃত্যুর আগে ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে মোসলেম উদ্দিন আহমদ কে দেখতে যান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং যুগ্ম সম্পাদক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ। সেই সময় মোসলেম উদ্দিন মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীকে সিনিয়র সহ সভাপতি করে পূর্ণাঙ্গ একটি খসড়া কমিটির কথা বিশেষ করে মোতাহেরুল ইসলামের নাম দুই নেতাকে জানান । এদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সফল সভাপতি, সাতকানিয়ার কীর্তিমান সন্তান মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় পরামর্শে কমিটিতে ‘সম্মানসূচক’ সদদ্য পদ প্রদানেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির হাল ধরতে যাচ্ছেন পটিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। গত ২২ ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্ষীয়ান এ নেতাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন। নতুন কোন সমীকরণ না হলে পটিয়ার মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির হাল ধরছেন এটা অনেকটা নিশ্চিত। মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী জেলা আওয়ামী লীগের গত কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন । এছাড়া তিনি গত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিরও চেয়ারম্যান ছিলেন । ঐ সম্মেলনেই মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ও মফিজুর রহমান পুন: সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হন। মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন দু:সময়ের একনিষ্ঠ কর্মী। ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের চরম দু:সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেফতার করে হাজিক্যাম্পের টর্চার সেলে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এত নির্যাতনের পরও তিনি কখনো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ন্যায়- নীতি, আদর্শ ও সততার প্রশ্নে তিনি ছিলেন বরাবরই আপোষহীন। সুদীর্ঘ ৫০ বছরেরও অধিক বর্ণাঢ্য রাজনীতি জীবনের নানা চড়ায় উৎরায় পেড়িয়ে তিনি আজকের এই অবস্থানে এসেছেন। ৭৫ পরবর্তী পট পরিবর্তনে আওয়ামীলীগ কোনঠাসা হয়ে পড়লে পটিয়াতে এস এম ইউসুফ, এম এ জাফর,সামশুদ্দিন আহমদ সহ আওয়ামী রাজনীতির হাতেগোনা যে কয়জন নেতা জীবন বাজী রেখে আওয়ামী লীগকে সুসংঘটিত করেছেন তাদেরই অন্যতম একজন মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী হুলিয়া মাথায় নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারন করে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছেন।কোন লোভ লালসা তাকে আওয়ামী লীগ থেকে ভিন্ন দলে নিতে পারেনি। তিনি জিয়াউর রহমানের মার্শালর সময়ে দীর্ঘ দিন কারা ভোগ করেছেন। মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী বৃহত্তর পটিয়া থানা যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি , পটিয়া থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি , দক্ষিন জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।সর্বশেষ তিনি দক্ষিন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি দলের পাশাপাশি পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সহ নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত পটিয়া বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে এগিয়ে থাকলেও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বে পিছিয়ে ছিল। এবার হয়ত পটিয়াবাসীর সে আসা পূরণ হতে চলেছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন, মোছলেম উদ্দিন আহমদের শারিরীক অবস্থার অবনতি হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানকে এভার কেয়ার হাসপাতালে ডেকে নিয়ে তার সাথে পরামর্শ করে মুমূর্ষ অবস্থার মাঝেও ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটির প্রাথমিক ফরমেট তৈরি করেন। ঐ কমিটিতে ১১ জনকে সহ সভাপতি, ৩ জনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৩ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদক, ৩৯ জনকে সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য আর ১৯ জনকে করা হয়েছে সদস্য। আর এ ফরমেট কমিটির এক নম্বর সিনিয়র সহ সভাপতি করা হয়েছে পটিয়ার মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রটি আরো নিশ্চিত করেছেন, ফরমেট কমিটিতে দক্ষিণ জেলার আওতাধীন ৮ টি উপজেলার সংসদ সদস্যদেরকে রাখা হয়েছে সদস্য হিসেবে। পূর্বের কমিটির খুব একটা পরিবর্তন না করে যারা মারা গেছেন তাদের স্থলাভিষিক্ত করার পাশাপাশি আরো চার জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন এ ফরমেটে। সভাপতি পদের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা কেন্দ্রে দৌঁড়ঝাপও করেছিলেন। সম্ভাব্য কমিটিতে সভাপতি পদে ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নাম বেশ জোরেসোরে শুনা গেলেও তাহার আগ্রহ না থাকায় তা আর হয়নি বলে জানা যায়। সভাপতি পদে আগের কমিটির চার সহ-সভাপতি পটিয়ার মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, আনোয়ারার আবুল কালাম চৌধুরী, সাতকানিয়ার মোহাম্মদ ইদ্রিছ ও বোয়ালখালীর এস এম আবুল কালাম, চন্দনাইশের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরী এবং আগের কমিটির সদস্য,চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক
সভাপতি আবু সুফিয়ানের নাম আলোচনায় ছিল। তবে মোহাম্মদ ইদ্রিছ ও আবু সুফিয়ান সাতকানিয়ার বাসিন্দা হওয়ায় সভাপতি পদে তাদের স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানও সাতকানিয়ার বাসিন্দা। সাবেক রাষ্ট্রদূত বোয়ালখালির এস এম আবুল কালামের নাম আলোচনায় এলেও সভাপতি পদের চেয়ে তিনি প্রয়াত মোছলেম উদ্দিন আহমদের সংসদীয় শূন্য আসনের উপ-নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দলের জৈষ্ঠ্য, ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীই হচ্ছেন আগামীর চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।