চট্টগ্রাম বনবিভাগ উত্তরের ধ্বংসের হোতা মালেকের হাতেই কি নিরাপদ মাতামুহুরির রিজার্ভ বন?
মালেকের সামনেই ধর্ষিত হচ্ছে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল
সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম অফিস
সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে বাজার বিকশিত হয়েছে। দেশের অন্য এলাকার নিরিখে পিছিয়ে থাকলেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে।
তবে পাহাড় হারিয়েছে বিস্তীর্ণ ঘন বন, বহমান ঝিরি, নদী। বাঁশ ও কাঠের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে পড়েছে বহিরাগতদের থাবা।
বন লুণ্ঠনের এ প্রতিযোগিতা বন্ধ এখনো হয়নি। গত দুই দশকে (২০০২-২০২৩) পার্বত্য চট্টগ্রামের শুধু বান্দরবান জেলায় প্রায় ১০ শতাংশ বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। বননির্ভর পাহাড়ি মানুষের বনে অভিগম্যতা কমেছে ৭৫ শতাংশ।
বন উজাড় এই পাহাড়িদের বিষণ্নতার চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
আর এখানে পাহাড় উন্নয়নের অভিঘাতের নেপথ্যে বান্দরবান জেলার লামা বনবিভাগে গত বছর যোগদান করা মাতামুহুরির রেঞ্জার আব্দুল মালেক।
একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক,বাংলাদেশের কুৃমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাসিন্দা এই মালেক, বনবিভাগে চাকুরীর সবচেয়ে সোনার হরিণে চড়েছেন যখন তিনি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহর রেঞ্জে চাকুরীতে ছিলেন তখন।
সূত্র নিশ্চিত করেছেন- কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাসিন্দা এই মালেক চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের শহর রেঞ্জসহ উত্তরে কয়েক বছর কর্মরত ছিলেন।
শহর রেঞ্জ তার চাকুরী জীবনের প্রথম পোষ্টিং ছিল বলে বনবিভাগের এক আমলা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহর রেঞ্জে থাকাকালীন তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকা কামিয়েছেন।
সেই চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের দূর্নীতির ক্যাশিয়ার খ্যাত রেঞ্জার মালেককে গত বছর চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ থেকে বান্দরবানের লামা বনবিভাগে বদলী করা হয়।
লামা ডিভিশনের সদরে অল্পকিছুদিন থাকার পর তাকে (মালেক)মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের রেঞ্জারের লোভনীয় পদে বদলি করা হয়।
লামা ডিভিশনের মাতামুহুরি রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন ছোট হয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক সংঘের পাহাড় ধ্বংসের নাটের গুরু আব্দুল মালেকের লামা বনবিভাগে পদায়নে এবং তার নেতৃত্বে লামা বনবিভাগের চিহ্নিত গাছ খেকোদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে দেশের অন্যতম মাতামুহুরীর রিজার্ভ বন।
ফলে লামার চিরসবুজের মাতামুহুরি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনায়নের গাছের পাতা ঝরে এখন বাগানজুড়ে শুকনো মর্মরা হয়ে যাচ্ছে।
তিনি(মালেক)লামা বনবিভাগের মাতামুহুরী রেঞ্জের নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েই পুনরায় তদবির করছেন চট্টগ্রামের উত্তর বনবিভাগে থাকতে।
শুধু তাই নয়,গত ডিসেম্বরে শেষ সপ্তাহে দফায় দফায় চট্টগ্রামের প্রধান বনসংরক্ষক কার্যালয়ের সাথে বদলীর জন্য জোরেশোরে তদবির চালানোর জোর গুঞ্জনও রয়েছে।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বন বিভাগের মধু-খ্যাত চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ ।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কেউ একবার যোগদান করলে আর অন্য জায়গায় যেতে চান না।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে সংযুক্ত হওয়া মানে কোটিপতি হওয়া।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বনের গাছ নিধন, পাহাড় নিধন ও লুটপাট। রেঞ্জার মালেক উত্তর বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা ছিলেন, তার দুর্নীতি নিয়ে তখন বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ প্রকাশের পর তাকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়।
পরে তাকে উত্তর বন বিভাগের সদর সার্ভে রেঞ্জ কর্মকর্তা পদেও রাখা হয় ।
রেঞ্জার মালেক লামায় বদলি হলেও এখনো তার ক্ষমতা চলে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগে এখনো রয়েছে তার শক্ত অবস্থান।
অভিযোগ ওঠেছে, চট্টগ্রামের সিএফকে কোনরকম ম্যানেজ করতে পারলেই আবারো লাফ দিবেন তার পুরাতন স্টেশন চট্টগ্রাম উত্তরে।
সূত্র জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন বিভাগে বহু সমালোচিত বদলী বানিজ্যের যে শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে, সেই সিন্ডিকেটেরই একজন সক্রিয় সদস্য মি:মালেক।
এই মালেকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘের পাহাড় নিয়ে বন বিভাগের সাথে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় আইন অমান্য করে ইসকনকে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণে সহযোগিতার চরম অভিযোগও রয়েছে।
সর্বশেষ- চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের লোভ সামলাতে না পেরে লামা উপজেলার বিভিন্ন কাঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সাথে বৈঠক করে তার লোভাতুর দৃষ্টি এখন মাতামুহুরী রিজার্ভের দিকে।
লামার সচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, এই আব্দুল মালেকের হাতেই কি তবে শেষ হবে এই সংরক্ষিত বনায়ন?
টিপি চেকিং জোত পারমিটের নামে এবং গাড়ী লোডিং থেকে বান্দরবান লামার পাহাড় বিনাশের মাধ্যমে কামাই করে যাচ্ছেন মাসে ৪/৫লক্ষ টাকারও অধিক।
অবৈধ ওই টাকার সিংহ ভাগ চলে আসছে চট্টগ্রাম নগরীতে, আর ওদিকে তার এসব কর্মকান্ডে রহস্যময় দর্শকের ভূমিকায় আছেন লামা ডিভিশনের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।
সূত্র আরো নিশ্চিত করেছেন, বান্দরবান লামা ডিভিশনের মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের রেঞ্জারের দায়িত্বে থাকলেও। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলেরই পোষ্টিং বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
কারণ ঢাকা প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয়ের সাথে তার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বস্ত ওই সূত্র।
জানা যায়, একদিকে শক্ত সিন্ডিকেট অপরদিকে ঢাকায় প্রধান বন সংরক্ষক কার্যালয়ের খুঁটির জোরেই মূলত লোভনীয় পদে চাকুরী করার সকল সিঁড়িই যেন এই মালেকের কব্জায়।
আব্দুল মালেকের সাথে বিভিন্ন সময় কাজ করা একাধিক কর্মকর্তা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন মালেকের নিজ জেলা কুমিল্লা এবং বুড়িচং উপজেলায় হলেও চট্টগ্রামে নামে বেনামে গড়েছেন অট্টালিকা।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বন বিভাগ উত্তরের সাবেক এই দাপুটে আমলা এবং বর্তমানে লামার মাতামুহুরি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো:আব্দুল মালেককে ২দিন ধরে কল করা হলে এবং প্রতিবেদকের পরিচয় দিলে টেক্সট করা হলেও তার জবাব নেয়া সম্ভব হয়নি।
ফোন না ধরার কারণে চট্টগ্রাম নগরীসহ উত্তর এবং দক্ষিণে এই মালেকের নিয়ন্ত্রণাধীন বেপরোয়া গার্ড সিন্ডিকেটের বিষয়েও তথ্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
আব্দুল মালেকের সামনেই গাছ খেকোদের দ্বারা নিয়মিত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বন,এমন অভিযোগের বিষয়ে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে কল করা হলে তাকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।
এদিকে লামার একাধিক স্থানীয়রা প্রতিবেদককে একাধিক তথ্য দিয়ে লামা বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দেয়ার বিভিন্ন ফিরিস্তি তোলে ধরেন,যা অবশ্য প্রতিবেদকের সেরেস্তায় সংরক্ষিত আছে।