আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে পাহাড়ে হাতি-মানুষের সংঘাত: ১০ বছরে প্রাণহানী ১৫ মানুষের, ১৪ হাতির

বাঁশখালীতে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত-

 

বাঁশখালী চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়েছে। “বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি। ’ হাতির বিলুপ্তি রোধ, সুরক্ষা এবং তাদের আবাসস্থল ধরে রাখার সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়। বুধবার ১২ আগষ্ট নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হল রুমে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের অর্থায়নে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ উদ্যোগে র‍্যালী, আলোচনা সভা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ ফ ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ জনকে সর্বমোট ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে ও বাঁশখালী জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হকের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন, সরকারী আলাওল কলেজের
সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, প্রাণী সম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. জুলকারনাইন শাওন, চাম্বল বিট কর্মকর্তা মোঃ দিদার, নাপোড়া বিট কর্মকর্তা অঞ্জন কান্তি বিশ্বাস, পুইছুড়ি বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসান প্রমূখ।

সভায় বক্তারা বলেন , চুনতি সংরক্ষিত পূর্ব জঙ্গল চাম্বলের চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি স্থাপন করেছেন অন্তত শতাধিক পরিবার। শুধু চাম্বল অংশে না, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর অংশে বনে বসতি গড়েছেন জলবায়ু উদ্বাস্তুরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হাতির আবাসভূমি। বনে মানুষের উপস্থিতির কারণে খাদ্যসংকটে পড়েছে বন্যহাতিরা। সংরক্ষিত বনে বসতি গড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতি। হাতি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়েছে। সংকুচিত হয়েছে আবাসস্থল। উদ্বাস্তুরা গহিন বনে হাতির খাদ্যযোগ্য গাছপালা ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ শুরু করেছে। তাই হাতি বাধ্য হয়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এই সংকট বাড়তে থাকলে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ার পাশাপাশি নষ্ট হবে পরিবেশের ভারসাম্য।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণীর ২৪ হাজার ৪৫৪ একরের মধ্যে জলদী বন্যপ্রাণী অভ্যারণ্য রেঞ্জ ১৫ হাজার ৫৯৬ একর অংশ বাঁশখালী উপজেলায়। এ অভয়ারণ্যে ১টি রেঞ্জ ও ৪টি বিট এ উপজেলায়। এ উপজেলার পূর্বপাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতি চলাচলের করিডর। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরের মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে হাতি মারা গেছে ১৪টি, প্রাণহীন হয়েছে ১৫ জন মানুষ।

স্থানীয় শিলকূপ আষিঘর পাড়া এলাকার কৃষক আবদুর রশীদ, ইনফাস মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করলেও হাতি দ্বারা আক্রান্ত হইনি। কয়েক বছর ধরে চাষবাসে নতুন আতঙ্ক বন্যহাতি। প্রায় সময় রাতের বেলা দলবেঁধে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত ধ্বংস করে।

স্থানীয় চাম্বল এলাকার কৃষক রামপ্রসাদ দাশ, রাজীব দাশ বলেন, হাতি এলে শিস দিয়ে সবাইকে এক করা হয়। এরপর আগুন জ্বেলে গহিন বনের দিকে হাতির পালকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন আর লোকালয় কাছাকাছি। উপকূলীয় এলাকার অনেকে বনের জমিতে বসতি স্থাপন করছে, যা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। হাতির বাসস্থান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং হাতিদের জন্য খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে।

উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষ আর হাতির দ্বন্দ্ব বেড়েছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এতে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁর মতে, এভাবে পাহাড়ে মানুষের পুনর্বাসন হতে থাকলে হাতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরো বাড়বে।

বাঁশখালী সরকারী আলাওল কলেজের
সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান বলেন, হাতির আবাসস্থল হচ্ছে বনাঞ্চল। সেই বনের যদি স্বাস্থ্য ভালো না থাকে, তাহলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসবে। হাতি ভালো রাখতে হলে নিরাপদ আবাসস্থল, পানি ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। বনাঞ্চলে অবাধে গাছ কাটা, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন, বন দখল করে বসতি স্থাপনের ফলে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। তা ছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডার কমে গেছে। কিন্তু খাবারের অভাবে প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে হাতি। এতে বেড়েছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের ঘটনা।

এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন বলেন, সংরক্ষিত বনে বসতি গড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতির। হাতি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়েছে। সংকুচিত হয়েছে আবাসস্থল। উদ্বাস্তুরা গহিন বনে হাতির খাদ্যযোগ্য গাছপালা ধ্বংস করে আমরা বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ শুরু করেছি। তাই হাতি বাধ্য হয়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। হাতিকে বাচিয়ে রাখতে না পারলে পরিবেশ টিক থাকবে না। পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় হাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হাতির বিচরণ ক্ষেত্রে কোন রকম বাঁধা গ্রস্ত করা যাবে না।

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.