ক্যাশের বদলে পোষ্টিং বানিজ্যের ঘুষ নেয়ার ডিজিটাল পদ্ধতির আবিস্কারক :এম এ হাসান
উপ বনসংরক্ষকের রমরমা বদলি বাণিজ্য, ঘুষ নেন এসএ পরিবহনে!
চট্টগ্রাম অফিস
গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় শুরু হয় ব্যাপক রদবদল। বিভিন্ন অধিদপ্তরে পদ-পদবী পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের সরিয়ে এনে বসানো হয় দীর্ঘদিনের সুবিধাবঞ্চিত কর্মকর্তাদের। কিন্তু এই সুযোগে কিছু মুখোশধারীও সুবিধাজনক পদে জায়গা করে নেয় যাদের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপবন সংরক্ষক ও উপকূলীয় বন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এমএ হাসান।
চাকরিজীবনের শুরু থেকে নানা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত এই কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের পরই কথিতভাবে শুরু করেন নতুন অনিয়ম দুর্নীতির অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপবন সংরক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি রমরমা বদলি বাণিজ্য করে যাচ্ছেন, এতে করে তিনি রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম উপকূলীয় বনাঞ্চলে বদলিকে কেন্দ্র করে ছয় লাখ টাকা এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এই চুক্তির অংশ হিসেবে এক লাখ টাকা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এমএ হাসানের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তেমনই একটি এসএ পরিবহনের পার্সেল বুকিং রশিদও এসেছে গণমাধ্যমের হাতে। রশিদে প্রাপক হিসেবে এমএ হাসানের নাম এবং মোবাইল নাম্বার ও টাকার পরিমাণ হিসেবে এক লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে।
রশিদটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও কিন্তু রশিদটি সঠিক বলে জানানো হয়। এ ঘটনায় বন বিভাগের বদলি বাণিজ্য এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগটি নিয়ে চলছে চাঞ্চল্য।
সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলীয় বন বিভাগের একটি রেঞ্জে বদলির জন্য এমএ হাসানের সাথে ছয় লাখ টাকার ঘুষের মৌলিক চুক্তি হয় একজন রেঞ্জ কর্মকর্তার। ওই অর্থ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এমএ হাসানের কাছে পাঠানো হয়। কুরিয়ার রশিদে প্রেরক হিসেবে বন বিভাগের একজন কর্মকর্তার নামও আছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের এক রেঞ্জ কর্মকর্তা রশিদ কান্ডের বিষয়ে বলতে গিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমএ হাসানের একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট রয়েছে। পুরো চট্টগ্রাম বন বিভাগের কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব রয়েছে। তিনি বন সংরক্ষকের (সিএফ) ডান হাত বা ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করেন। সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালেও তিনি বন সংরক্ষক মিহির কুমার দের অধীনে কাজ করেছেন। তখন থেকে তাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা পাঠালে লেনদেনের প্রমাণ থেকে যায়। ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে বিভিন্ন কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্যের অর্থ লেনদেন করা বন বিভাগের পুরাতন রীতি।
তাঁর দাবি, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের ঘটনা নতুন নয়। বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি বাগান সৃজন প্রকল্পের অর্থ লেনদেনেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এমএ হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আপনি প্রেরকের সাথে কথা বলেন, এছাড়া কেউ ঘুষ দিয়ে থাকলে তার সাথে কথা বলেন, সে কবে, কখন, কোথায় কোন পোস্টিংয়ের জন্য আমাকে ঘুষ দিয়েছে, আমি কখন কি ভাবে টাকা নিয়েছি, সেটা একটু দেখেন, আপনারা সত্যটা উদঘাটন করেন সেটাই আমার চাওয়া, আমি আমার বিচার চাইতেছি আপনাদের কাছে, জয়দেব যেটা করেছে সেটার বিচার না, আমার বিচার চাই, ঠিক আছে ভাই বলে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েজ দেন তিনি। এরপর তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবী করে একটি প্রতিবাদ লিপিও পাঠান অন্য পত্রিকার নামে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমএ হাসান তাঁর অধীনে সুন্দরবনে কাজ করেছেন, এটি সত্য। তবে কেউ তাঁকে ডান হাত বা বাম হাত বলতে পারেন। এমএ হাসান তাঁর ডান হাত ছিলেন না।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনাটি দেশের বনবিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানাজানি হওয়ার পর এই তথ্য ফাঁস কে করেছে! সেটা যাচাইয়ের জন্য তিনি বেশ কয়েকজন রেঞ্জারকেও অফিসে ডেকেছেন বলে সদর দপ্তর সূত্র নিশ্চিত করেছেন।