দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসনকে। উপজেলার খাগরিয়ার গণিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিতে আওয়ামী লীগের আকতার হোসেন (নৌকা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিনের (মোটর সাইকেল) অনুসনারীদের অস্ত্রবাজির দৃশ্য গণমাধ্যম ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। প্রথম পর্যায়ে অস্ত্রধারীরা নিজেদের অনুসারী নয় দাবি করে দুই প্রার্থীই পরস্পরকে দোষারোপ করলেও অস্ত্রবাজদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর দুই প্রার্থীই গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন।
তবে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন বলেন, দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে দলে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অনুপ্রবেশকারীরা সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলার জন্য নানা অপকর্ম করে। খাগরিয়ায় ‘অস্ত্রবাজি’ তারই অংশ কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা দলে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, অস্ত্রবাজি করা সন্ত্রাসীরাতো আইনের আওতায় আসবেই, পাশাপাশি অস্ত্রবাজদের ইন্ধনদাতা, অর্থদাতাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সাতকানিয়ার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের দিনে সাতকানিয়ার খাগরিয়া, বাজালিয়া, সোনাকানিয়া, পশ্চিম ঢেমশা, চরতী, কালিয়াইশ ও নলুয়ায় ব্যাপকভাবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দেখা যায়। অস্ত্রের এমন মহরায় অস্থির হয়ে উঠে সাতকানিয়া। বাজালিয়া বোর্ড অফিস কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয় নগর থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তাপস দত্তের পক্ষে ভোট করতে কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া আব্দুশ শুক্কুর। নলুয়ার মরফলা বোর্ড অফিস কেন্দ্রে দুর্বৃত্তের কিরিচের কোপে নিহত হয় নিরীহ শিশু তাসিফ (১৩) নামের এক স্কুল শিক্ষার্থী।
অস্ত্রবাজির এমন দৃশ্য গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে যা ছিল খাগরিয়ার গনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের। স্থানীয়দের সনাক্ত মতে, গণিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে অস্ত্রবাজরা হলো খাগরিয়ার ৬নং ওয়ার্ডের মাইজপাড়ার মোহাম্মদ নিশান। তিনি ছাত্রলীগ কর্মী। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ায় চেয়ারম্যান আকতার হোসেনকে মালা পরিয়ে দেয়ার ছবি নিজের আইডিতে শেয়ার করেন। আরেকটি ছবিতে নিশানকেই আকতার হোসেন চেয়ারম্যান মালা পরিয়ে দিতে দেখা যায়। আরেকজন হচ্ছেন নতুন চরখাগরিয়া গ্রামের যুবলীগ কর্মী সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ শওকত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে তাকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। অস্ত্রবাজিতে শনাক্ত হওয়া অন্য দুই জন হলেন খাগরিয়ার মোহাম্মদ খালী গ্রামের নাছির উদ্দিন ও মোহাম্মদ সাকিব। তারাও যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাথে জড়িত। তারা সবাই নৌকার পক্ষে কেন্দ্র দখলে অস্ত্র নিয়ে মহরা দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
তবে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা জসিম উদ্দিনও কম যাননি। তার অনুসারীরাও গুলির জবাবে গুলি ছুরতে দেখা গেছে। জসিম উদ্দিনের পক্ষে অস্ত্রবাজি করা একজন হচ্ছেন কায়েস। অপরজন হচ্ছেন নুরুল আবছার।
এবিষয়ে জানার জন্য আওয়ামী লীগ প্রার্থী আকতার হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সেল ফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে গত বুধবার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অপরাধ) জাকির হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পুুলিশ সুপার রশিদুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আফরুজুল হক টুটুল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (চট্টগ্রাম দক্ষিণ) জাহাঙ্গীর আলম ও সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিবলী নোমান বাজালিয়া, খাগরিয়া ও নলুয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
নাম প্রকাশ হবে না শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে অস্ত্রবাজির ছবি-ভিডিও মিডিয়ায় ঢালাওভাবে প্রচার হওয়ার কারণে প্রশাসন বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে। এটি কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রশাসন কাজ করছে। ইতোমধ্যে অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ও র্যাব মাঠে নেমেছে। কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। এদের কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্র, গুলিও। অভিযান অব্যাহত আছে। বাকি অস্ত্রধারীদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।