শর্তভঙ্গ করে চুক্তি বাতিলের অভিযোগ যমুনা অয়েলের বিরুদ্ধে

বিপাকে ফিলিং স্টেশনের মালিক

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

শর্তে উল্লেখ রয়েছে পর পর দুই মাস লাইসেন্স ফি পরিশোধ না করলে এক মাসের নোটিশে বাতিল করা যাবে চুক্তি। এছাড়া অন্যান্য কারণে এই চুক্তি বাতিল করতে হলে ৯০ কার্যদিবসের নোটিশ দিতে হবে। তবে এসব শর্ত না মেনে চট্টগ্রাম নগরীর সল্টঘোলা ক্রসিং এলাকার ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের অভিযোগ উঠেছে যমুনা অয়েল কোম্পানির (জেওসিএল) বিরুদ্ধে। জেওসিএলের সেই আদেশের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক ভুক্তভোগী এহেতেশাম রসুল খান। পিটিশনটির শুনানি শেষে আদালত জেওসিএল কতৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন।

এদিকে, হঠাৎ চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনের মালিক ও জেওসিএলের ডিলার এহেতেশাম রসুল খান। এই কয়েকদিনে কয়েক লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি তার। এছাড়া বেকার হয়ে পড়েছেন ফিলিং স্টেশনে চাকরি করা শ্রমিকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে ইন্দোবার্মা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড (আইবিপিসিএল) চট্টগ্রাম বন্দর কতৃপক্ষ (চবক) থেকে দক্ষিণ হালিশহর মৌজা এলাকায় শূন্য দশমিক ২৮ একর জায়গা ইজারা নেয়। সেই জায়গায় নিজস্ব অর্থায়নে আইবিপিসিএল একটি ফিলিং স্টেশন গড়ে তোলে। ওই বছরের ১ আগস্ট স্টেশনটি পরিচালনার জন্য আইবিসিপিএল ইমাম শরীফের সঙ্গে চুক্তি করে। এরপর থেকে ইমাম শরীফ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার আইবিসিপিএলকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর আইবিসিপিএল জেওসিএলের সঙ্গে একীভূত হয়।

এরই মধ্যে ১৯৭২ সালের ১৩ অক্টোবর ইমাম শরীফ মারা যান। মৃত্যুর পর থেকে তার ছেলে মুসলিম খান প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছে। ২০১২ সালের ১৬ মে মুসলিম খানের মৃত্যুর হয়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছে মুসলিম খানের ছেলে এহেতেশাম রসুল খান। জেওসিএল থেকে বিপিসির কাছে সরবরাহ করা এক প্রতিবেদনেও ইমাম শরীফ মৃত্যুর পর মুসলিম খান এবং তারপর এহেতেশাম রসুল খান ফিলিং স্টেশনটি পরিচালনা করে আসছেন বলা হয়। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য সনদও রয়েছে এহেতেশামের নামে। আবার বন্দর কতৃপক্ষকেও বছরের পর বছর ইজারার টাকা পরিশোধ করেছেন মুসলিম খান এবং এহেতেশাম।

এদিকে, ইমাম শরীফ মৃত্যুর পর ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে তার ছেলেদের মামলা হয়। ১৯৮৯ সালে এই মামলা শুরু হয়। এসব মামলায় ইমাম শরীফের সম্পত্তি হিসেবে ফিলিং স্টেশনটি অন্তর্ভুক্ত হয়। মামলার একপর্যায়ে ১৯৯৫ সালে আদালত ফিলিং স্টেশনে রিসিভার নিয়োগের আদেশ দেন। পরবর্তীতে এই মামলায় জেওসিএল কর্তৃপক্ষ ৫৯ নম্বর বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হয়। পক্ষর্ভুক্তির জেওসিএলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিসিভার নিয়োগের আদেশ বাতিল করে দেয় আদালত।

জেওসিএল সূত্র জানায়, সবশেষ ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই পরবর্তী পাঁচ বছর ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশন পরিচালনার জন্য এহেতেশামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় জেওসিএল কতৃপক্ষ। এ হিসেবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের ৩০ জুন। তবে এরই মধ্যে গত ৮ মার্চ কোনো রকম কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে জেওসিএল। অথচ দুই পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির শর্তের ২ (ডি) নম্বরে উল্লেখ রয়েছে- পরপর দুই মাসের লাইসেন্স ফি প্রদান না করার ক্ষেত্রে, কোম্পানির এক মাসের নোটিশ দিয়ে লাইসেন্স বাতিল করার অধিকার থাকবে।

একই চুক্তির ১৯ নম্বর শর্তে উল্লেখ রয়েছে- যেকোনো সময় মেয়াদ শেষ হওয়ার জন্য লিখিতভাবে ৯০ দিনের নোটিশ দেওয়ার পরে উভয় পক্ষের দ্বারা লাইসেন্সটি বাতিল করা যেতে পারে। এই ধরনের যেকোনো নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে লাইসেন্সটি বাতিল হয়ে যাবে।

ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনের মালিক এহেতেশাম রসুল খান বলেন, ‘আমার মার্কেটে লাখ লাখ টাকা বাকি। তেল সরবরাহ করতে না পারায় এসব টাকা আমি তুলতে পারছি না। তাছাড়া আমার শ্রমিকরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের আমি বেতন দিতে পারছি না। কোনো রকম কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া যমুনা আমার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। অথচ যমুনার হয়ে দীর্ঘদিন আমি মামলা পরিচালনা করেছি। আমার মনে হচ্ছে এক ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যমুনা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি অনতিবিলম্বে তাদের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এছাড়া প্রতিকার পেতে আমি ইতোমধ্যে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেওসিলের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘আইনগত কিছু জটিলতা থাকায় চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। কোম্পানির ৪৯৩ তম পর্ষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য এতে কোম্পানি এবং ডিলার উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। জটিলতা নিরসন হলে পুনরায় তেল সরবরাহ করা হবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.