গল্প শুনিয়ে চসিকের সাত বছর পার

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন

চট্টগ্রামের হালিশহর আনন্দবাজার এলাকার ১০ একর জায়গাজুড়ে ময়লার ভাগাড়। বছরের পর বছর ধরে নগরের সমস্ত বর্জ্য স্তূপ করা হচ্ছে সেখানে। আর তাতেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার দশা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনন্দবাজারের ওপর চাপ কমানোর জন্য নেওয়া হয় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। সাত বছর আগে চট্টগ্রামসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু তিন বছর আগে জায়গা সংকটে হঠাৎই মুখ থুবড়ে পড়ে প্রকল্পটি। পরবর্তীতে প্রকল্প বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত ১৬টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে(চসিক) আগ্রহপত্র জমা দেয়। সর্বশেষ সেখান থেকে যাচাই–বাছাই করে ৫টি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। তবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় এখনো আলোর মুখ দেখেনি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পটি।

অথচ একই সময়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে নেওয়া প্রকল্প প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। যদিও গত বছর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মেয়রের সঙ্গে এক সৌজন্যসাক্ষাতে চলতি বছর (২০২২) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে জানিয়েছিলেন। যদিও বাস্তবে তা ঝুলে আছে মন্ত্রণালয়ে।

চসিক সূত্রে জানা যায়, এর আগে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া বর্জ্য থেকে দৈনিক ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০১৩ সালে ইতালীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। তবে কেন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি, সেটির কোনো মূল্যায়ন হয়নি। পরবর্তীতে তার দুই বছর পর ২০১৫ সালে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের (নগর উন্নয়ন) নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। গঠিত ওই কমিটি আগ্রহপত্রের প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠালে বিদ্যুৎ বিভাগ চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।

এদিকে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আগ্রহপত্র জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড তারা দৈনিক ১ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য এবং ১০ একর জমি প্রয়োজন বলে চসিককে জানায়। একইভাবে টেকনিস রিউনিডাস আলফানার এন্ড সিইইজি ইম্প্যাক্ট এনার্জি লিজ নিয়ে ১০ একর জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার আগ্রহ জানায়। স্যাটারাম ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-জয়েন্ট ভেঞ্চার নামের প্রতিষ্ঠান দৈনিক ১ হাজার টন বর্জ্য এবং ১০ থেকে ১৫ একর জমির প্রয়োজন জানায়। অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড ১০ একর জমিতে ১৪০০ টন থেকে ১৫০০ টন বর্জ্যের চাহিদা জানায়। গ্রিন পাওয়ার লিমিটেড নামের আরেক প্রতিষ্ঠান জমির কথা উল্লেখ না করলেও ৫০০ টন বর্জ্যের তথ্য দেয়। সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি আগ্রহপত্র দিলেও জমি বা বর্জ্যের চাহিদার তথ্য দেয়নি।

অন্যদিকে, স্কোলার্স পাওয়ার লিমিটেড ২২ একর জমি, ডঙ্গুয়ান কিউই রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ৩০ একর জমি, লিড এন্ড ইপিসি পার্টনার ও এসডিআইসি পাওয়ার হোর্ল্ডি কো. লিমিটেড ও লোকাল পার্টনার ও অরচার্ড গ্রুপ ৩০ একর জমি, এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড ৬ দশমিক ৬৮ একর জমি, সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড ৪০ একর, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট ৩০ একর জমি, কনসোর্টিয়াম অব সিএনটিআই এলওয়াইজেড ১ হাজার টন বর্জ্য, নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড ২৮ একর জমি, গার্ডিয়ার নেটওয়ার্ক ২০ একর, কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান কোনো তথ্য জানায় নি। তবে এরমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির ব্যবস্থা কোম্পানিই করবে বলে চসিককে প্রস্তাব দেয় সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, গার্ডিয়ার নেটওয়ার্ক, এবং নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড।

এ প্রতিষ্ঠানগুলো বর্জ্য সংগ্রহ, সংগ্রহের জন্য যাবতীয় যানবাহন ও লোকবল, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নিয়ে যাওয়াসহ সব ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে আগ্রহী। এরমধ্যে গত ২৫ আগস্ট যাচাই-বাছাই কমিটির সর্বশেষ সভায় বিদ্যুৎ বিভাগকে চসিকের প্রস্তাবনার বিষয়ে দ্রুত পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলা হয়।

কিন্তু চসিকের এ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া যদি এ প্রকল্প নেওয়া হয় তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হবে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উৎপাদিত বর্জ্যের দাহ্য হওয়ার ক্ষমতা বা ক্যালরিফিক ভ্যালু খুবই কম হওয়ায় যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ পড়বে অনেক বেশি।

তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা। জাইকার সহায়তায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি মহাপরিকল্পনা তৈরির জন্য এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাক–সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য চসিককে প্রস্তাব দেয় জাইকা। কিন্তু এ প্রস্তাবনাও মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যদিও ২০১৮ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাক–সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল জাইকা।

সেই প্রতিবেদনে জাইকা জানায়— ঢাকা সিটি করপোরেশনের সংগ্রহ করা বর্জ্যের ক্যালিরিফিক ভ্যালু খুবই কম, প্রতি কেজিতে মাত্র ৬০০ কিলোক্যালরি; যা থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন অসম্ভব। বিশেষ ব্যবস্থায় বর্জ্যের ক্যালিরিফিক ভ্যালুর মান বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

এ বিষয়ে চসিক মেয়রের একান্ত সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হাশেম সিভয়েসকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৬টি কোম্পানি প্রস্তাবনা দিয়েছে। আমরা সবগুলোই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে ৫টি কোম্পানিকে শর্টলিস্টে রাখা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখনো কোনো কোম্পানিকে চূড়ান্ত করেনি।’

উল্লেখ্য, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন চায় ১০০ একর জায়গা। এর অংশ হিসেবে দৈনিক ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০১৮ সালে চসিকের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো)। আর এ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী তৃতীয় পক্ষ বাছাই করবে পিডিবি। সবগুলো কোম্পানির তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং গঠিত কমিটির সুপারিশের অপেক্ষায় আছে তারা।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.