চট্টগ্রামে মাদকের মামলায় চার্জশিটভুক্ত এক আসামির ভুয়া মৃত্যু সনদ দাখিলের প্রমাণ পেয়ে ফখরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী নামে এক আইনজীবীকে কারণ দর্শানো নোটিস দিয়েছেন প্রথম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কামাল হোসেন সিকদার। পাশাপাশি ভুয়া মৃত্যু সনদে স্বাক্ষরকারী কক্সবাজার পৌরসভার এক মহিলা কাউন্সিলর এবং এক কর কর্মকর্তাকে আগামী ১ জুন আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল মামলার ধার্য তারিখে এ আদেশ দেয় আদালত।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এমএ ফয়েজ। তবে এর আগে নির্দেশনা পেয়ে গত ২০ মার্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়ে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ জানায়,আসামির মৃত্যু সনদটি ভুয়া। চলতি বছর ২৪ জানুয়ারি আসামি আলাউদ্দিনের মৃত্যু সনদটি যাচাইয়ের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত।
সূত্রটি জানায়, ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মো. আলাউদ্দিন ওরফে ভেট্টা (৩০) নামে মাদক মামলায় এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন মর্মে আদালতে মৃত্যু সনদ দাখিল করেন আইনজীবী ফখরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী। গত ১৩ এপ্রিল আসামি আলাউদ্দিনকে জীবিত হাজির করে আসামিকে আত্মসমর্পণ করান ওই আইনজীবী। এদিন আসামির জামিন আবেদন করলে শুনানি শেষে আলাউদ্দিনের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।
এর আগে শুনানির সময় আদালত বলেন, ‘আসামিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দিতে ভুয়া মৃত্যু সনদ দাখিল করে আদালতকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করেছেন আইনজীবী ফখরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কৌঁসুলি আসামিপক্ষে বশীভূত হয়ে অন্যায় লাভের আশায় তথ্য গোপন করে আসামিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির জন্য মিথ্যা মৃত্যু সনদ দাখিল করে আদালতকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করেছেন।’
গত বুধবার কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দিয়েছেন আইনজীবী ফখরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী। তার দাবি, আসামির স্ত্রী জোহরা বেগম (২৫) স্বামীর মৃত্যু সনদ তাকে (আইনজীবী) দিয়েছেন। পরে স্বামী জীবিত আছেন মর্মে প্রত্যয়নপত্রটিও তাকে দিয়েছেন জোহরা।
আইনজীবী আদালতকে আরও জানান, ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন আসামি আলাউদ্দিন। পরে স্ত্রী জানতে পারেন তার স্বামী দীর্ঘদিন ভারতের কারাগারে বন্দি ছিলেন। মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। আদালতে মৃত্যু সনদ দেওয়ার বিষয়টি ইচ্ছেকৃত নয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অতিরিক্ত মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এমএ ফয়েজ গতকাল বলেন, ‘আসলে এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি। আসামির স্ত্রীই যদি স্বামীর মৃত্যু সনদ এনে দেন, সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর কী করার আছে?’
জানা গেছে, আদালতের নির্দেশনা পেয়ে গত ২০ মার্চ আসামির মৃত্যু সনদ ভুয়া বলে আদালতে প্রতিবেদন দেন কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের এএসআই ছগির হোসেন। আসামি আলাউদ্দিন ওরফে ভেট্টা জীবিত আছেন মর্মে পুলিশকে একটি প্রত্যয়নপত্রও দেন কক্সবাজার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান।
এর আগে ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ আসামি মো. আলাউদ্দিনের মৃত্যু সনদ ইস্যু করেন কক্সবাজার পৌরসভার সংরক্ষিত ১ নম্বর আসনের মহিলা কাউন্সিলর হুমায়রা বেগম এবং সহকারী কর নির্ধারক আবু জাফর মো. এবাদুল্লাহ। ইস্যু করা ওই মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয় ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্ডিসজনিত কারণে আসামি আলাউদ্দিন মারা যান।
২০১৪ সালের ১৩ মার্চ নগরের আকবর শাহ থানা এলাকায় ৯ কেজি গাঁজাসহ আলাউদ্দিন (৩০) ও তার স্ত্রী জোহরা বেগম (২৫) এবং হাসিনা বেগমকে (২২) আটক করে। এ ঘটনায় আকবর শাহ থানায় মামলা করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন উপপরিচালক আবুল হোসাইন। তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন অঞ্চলের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশিদ আলম।
আলাউদ্দিনের বাড়ি কক্সবাজার সদর থানাধীন নানিয়ার ছড়া এলাকায়। বাবার নাম মোজাফফর আহমেদ। জোহরা বেগমের বাড়ি কক্সবাজার কলাতলী এলাকার আদর্শ গ্রামে। হাসিনার বাড়ি টেকনাফ উপজেলার দমদমিয়া এলাকায়।