বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত ও পাকড়াও করা সরকারের কর্তব্য-দয়াল কুমার বড়ুয়া

 

নিজস্ব প্রতিবেদক 

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার ঘটছে নিয়মিত এবং এ নিয়ে কারোর মধ্যে দ্বিমত নেই বললেই চলে। তবে অর্থ পাচারকারী কারা এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক এবং একই সঙ্গে বিভ্রান্তি। এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এ দেশে স্পুটনিক গতিতে ধনিক শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। যারা বিদেশে অর্থ পাচার করছে তাদের সঙ্গে আমজনতার কোনো সম্পর্ক নেই বা থাকার কথা নয়।
নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় এমন মানুষের সংখ্যা এখনো এ দেশে বিশাল। যারা বিদেশে অর্থ পাচার করে তাদের মধ্যে আমলা, কর ফাঁকিবাজ, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ রাজনীতিকদের কথাই বেশি উচ্চারিত হয়। অর্থ পাচার করে সুইস ব্যাংকে রাখা এত দিন বাংলাদেশি পাচারকারীদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। সারা বিশ্বের ধনীদের অর্থ জমা রাখার জন্য বহুদিন ধরে পরিচিত সুইজারল্যান্ড। নাম-পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখায় বিশ্বের আমানতকারীদের নির্ভরশীল ব্যাংক বলে পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো। এসব কারণে কর ফাঁকি দেওয়া ও অবৈধভাবে আয় করা অর্থ জমা হয় সুইস ব্যাংকে। গ্রাহক নির্দিষ্ট করে তথ্য না দিলেও এক বছর ধরে টাকার হিসাব প্রকাশ করছে ন্যাশনাল সুইস ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের শেষে বাংলাদেশিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৫২ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। প্রতি ফ্রাঁ ১২১ টাকা ধরে হিসাব করলে আমানতের পরিমাণ ৬৬৮ কোটি টাকা। এক বছর আগে জমার পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্রাঁ। এক বছরে বাংলাদেশিদের আমানত কমেছে ১০ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালজুড়ে বাংলাদেশি আমানতকারীরা সুইস ব্যাংক থেকে এ অর্থ তুলে নিয়েছেন। হঠাৎ করে সর্বনিম্নে নেমে আসার কারণ উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশ থেকে যারা অর্থ পাচারের অপকর্মে জড়িত তারা দেশ ও জনগণের বন্ধু যে নয় তা স্পষ্ট। পাচারকারীদের চিহ্নিত ও পাকড়াও করা সরকারের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত।
২০১৩ সালে সিঙ্গাপুর থেকে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার মতো সাফল্য অর্জন করেছে দুদক। তবে বলতে হবে, বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৭টি ‘পেডিকেট অফেন্স’ বা সম্পৃক্ত অপরাধের মধ্যে শুধু একটির (দুর্নীতি ও ঘুস) অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। বাকিগুলো সরকারের ছয়টি সংস্থা- সিআইডি, এনবিআর, বিএসইসি, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কাস্টমস মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত।
প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস ও গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ অন্যান্য সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিংহভাগ অর্থই ব্যবসা-বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানির আড়ালে পাচার হয়ে থাকে। দেশ থেকেও একই প্রক্রিয়ায় প্রচুর অর্থ ও সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। বস্তুত এসব বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দুদকের হাতে ন্যস্ত না থাকায় পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস, পেন্ডোরা পেপারস ছাড়াও অবৈধ সম্পদের অন্যতম গন্তব্যস্থল মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্প, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও সুষ্ঠু তদন্ত শেষে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাচার অন্যতম প্রতিবন্ধক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশ থেকে প্রতিবছর নানাভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থ পাচারের এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব অপরাপর সংস্থার পাশাপাশি দুদকের ওপর ন্যস্ত হলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে, তা বলাই বাহুল্য।

লেখক: দয়াল কুমার বড়ুয়া, কলামিস্ট ও জাতীয় পার্টি নেতা, সভাপতি, চবি অ্যালামনাই বসুন্ধরা। সংসদ সদস্য প্রার্থী ঢাকা-১৮ আসন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.