পটিয়ার সেই প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসের বিরুদ্ধে দন্ডাদেশ

চট্টগ্রাম সংবাদের খবরের জের-

 

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

হিলচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো: শফিকুল ইসলাম এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

জানা যায়, ১ আগস্ট হিলচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৩ (খ) “অসদাচরণ” ও ৩ (ঘ) বিধি মতে “দুর্নীতি পরায়ন” এর অভিযোগে অভিযুক্ত করে বিভাগীয় মামলা নং ১১/২৩ রুজু করা হয়।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক গত ৮ আগস্ট লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং ২৭ আগস্ট ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের দাখিলকৃত জবাব, ব্যক্তিগত শুনানীতে প্রদত্ত বক্তব্য, বিভাগীয় মামলার প্রাসঙ্গিক রেকর্ড পত্রাদি ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৪ (২) (খ) উপবিধি অনুযায়ী ০১ (এক) বছরের জন্য ০১ টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি
স্থগিত করে ‘লঘুদন্ড’ প্রদান করা হলো। উক্ত স্থগিতকৃত বেতন পরবর্তীতে তিনি বকেয়া হিসেবে প্রাপ্য হবেন না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নামমাত্র বেতনে কোন প্রকার নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই পটিয়ার প্রত্যন্ত এলাকা লাওয়ারখীল বেসরকারি বানেস্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে ফেরদৌস আরা বেগম শিক্ষকতা শুরু করেন। এক সময় এই বিদ্যালয়ে ১০/১৫ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। তখন ৫০০/১০০০ টাকা বেতনে কেউ ১/২ বছরের বেশি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতনা। একটানা ঐ স্কুলে থেকে যাওয়ায় কয়কবার পরীক্ষা দিয়ে কোন রকমে এইচএসসি পাস করা ফেরদৌস আরা বেগম হয়েযান এই বিদ্যালয়ের পুরাতন শিক্ষক। সেসুবাধে কোন পরীক্ষা ছাড়াই তিনি বনেযান বানেস্বর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া সরকার ২০১৩ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যে যে অবস্থায় আছে সে সে অবস্থায় সরকারি করন করলে কপাল খুলে যায় ফেরদৌস আরা বেগমের। সরকারি হওয়ার পর তিনি রশিদাবাদস্থ এক আওয়ামী লীগ নেতার মাধ্যমে তদবির করে বদলি হয়ে চলে আসেন নিজ গ্রামের হিলচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হিলচিয়া স্কুলে যোগদানের পর থেকে তার বিরুদ্ধে একাডেমিক অদক্ষতা, আর্থিক অনিয়ম, অসদাচরণ,ভর্তি ও পরীক্ষার ফি’র নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং সময়মত ও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হওয়া সহ একাধিক অভিযোগ পাওয়া যায়। ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পাঠদানে অক্ষম ফেরদৌস আরা বেগমের নিজের হাতের ৯ লাইনের একটি বাংলা লেখায় সবকটি বাক্য অশুদ্ধ ও প্রায় ১০ টি বানান ভুল করেন। পটিয়ার এমপি ও সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী বিষয়টি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কে নির্দেশ দেন।
বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি হওয়ায় তার স্বামী নুরুল ইসলামের সাথে তিনি সামাজিক বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের সাথে নিজেও জড়িয়ে পড়েন। মাঠের মাঝখানে খুঁটি গেঁড়ে স্কুলের সম্পত্তি বেদখল করার কাজে তিনি তার স্বামীকে সহায়তা করেন। এই ঘটনায় তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু আহমদ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের ছাঁদ ঢালাই কাজের দিন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা,সভাপতি সহ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সকল সদস্য উপস্থিত থাকলেও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। সেদিনই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়ের একটি খাতায় বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেন। স্বামীকে সভাপতি করে পছন্দমত একটি পকেট কমিটি গঠনের জন্য তিনি অপতৎপরতা চালান।

প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগমের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলা উদ্দিনকে প্রধান করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলাম এর দপ্তরে গত ১ আগস্ট এই বিভাগীয় মামলা রুজু হয়।

ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম মিন্টু জানান, আমাদের বিদ্যালয়ের একটা নাম ডাক ছিল।
ফেরদৌস আরা বেগম আসার
পর থেকে স্কুলের লেখা পড়ার মান তলানিতে নেমে এসেছে। যিনি শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজি পড়াতে পারেন না এমনকি যার বাংলা বানানে অহরহ ভুল থাকে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আসা করা যায় না।

আরেক অভিভাবক সদস্য বজলুর রহমান ওয়াহেদ জানান, তিনি নিয়মিত এবং সময়মত স্কুলে আসেননা। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি ফি ও পরীক্ষার ফি’র নামে তিনি টাকা নিয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু আহমদ আমার মোবাইল থেকে তাহাকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,’স্যার বেশি না প্রতি বছর যেভাবে নিয়েছি ঐরকম নিয়েছি বলে বিষয়টি শিকার করেন।

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগম তার বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দেয়া তদন্ত প্রতিবেদন কে মিথ্যা দাবি করে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের খেয়ে ধেয়ে কোন কাজ নেই। আমাদের বিরুদ্ধে কোন কিছু পেলেই দৌড়ে স্কুলে চলে আসে।

পটিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দেবাশীষ বিশ্বাস জানান,আমরা তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পেয়েছি। আমাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়। উক্ত মামলায় তার বিরুদ্ধে এই দণ্ডাদেশ দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলায় ১ বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করনের রায় দেয়া হয়।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.