চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা লাইটারেজ সংকট

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামালবাহী প্রায় ৯০টি মাদার ভেসেল বর্তমানে সাগরে অলস বসে আছে। গত তিন দিনে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে কোনো লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ না পাওয়ায় আমদানিকারকরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই সংকটের পেছনে লাইটারেজ জাহাজের অভাবের চেয়ে অব্যবস্থাপনা ও জাহাজের অপব্যবহারই বেশি দায়ী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে খাদ্যশস্য নিয়ে আসা বেশ কিছু লাইটারেজ জাহাজ বিভিন্ন গন্তব্যে গিয়ে পণ্য খালাস না করে মাসের পর মাস সাগরে ভাসছে। আমদানিকারকরা এসব জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যার ফলে পণ্যবাহী এসব জাহাজ মূল ধারায় ফিরে আসতে পারছে না। ব্যবসায়ী মহলের মতে, এটি একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সংকট।

চট্টগ্রাম বন্দরে সিরিয়াল প্রথা ও বিডব্লিউটিসিসির অধীনে শ্রমিক সংগঠনের ‘দৌরাত্ম্য’ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক মালিক তাদের লাইটারেজ জাহাজ এখন মোংলা চ্যানেলে সরিয়ে নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম বন্দরে যেখানে একটি জাহাজ খালি হতে ২০ থেকে ২২ দিন সময় লাগে, সেখানে মোংলায় সিরিয়াল বা শ্রমিক সংগঠনের বাড়তি ঝামেলা না থাকায় এবং লোডিং-আনলোডিং ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় মালিকরা সেখানে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। বিডব্লিউটিসিসির বর্তমান সিরিয়াল সিস্টেমকে অস্বচ্ছ বলে অভিহিত করেছেন সাধারণ মালিকরা। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী নেতারা দ্রুত ট্রিপ পেলেও সাধারণ মালিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, আগে যেখানে একটি বড় জাহাজ খালাস করতে ৮ থেকে ১০ দিন লাগতো, এখন সেখানে ২০ থেকে ৩০ দিন সময় লাগছে। বর্তমানে বহির্নোঙরে থাকা প্রতিটি মাদার ভেসেলকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা করে ড্যামারেজ বা জরিমানা গুনতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ তাদের নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও বাকি আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল থেকে জাহাজ বুকিং নেন। দৈনিক ৮০টি লাইটারেজ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তিন দিন সেল থেকে কোনো জাহাজ দেওয়া হয়নি। যে কারণে অর্ধশতাধিক জাহাজের পণ্য খালাস বন্ধ আছে।

বিডব্লিউটিসিসি এই সংকটের পেছনে ঘন কুয়াশা এবং বিএডিসির সারের কাজে নিয়োজিত ১৪০টি জাহাজ আটকে থাকাকে দায়ী করেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কুয়াশার কারণে কিছুটা দেরি হলেও মূল সমস্যাটি ব্যবস্থাপনার। সংকট নিরসনে জাহাজের সিরিয়াল প্রথা তুলে দিয়ে উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছেন অপারেটররা।

ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ বলেন, বর্তমানে বহির্নোঙরে প্রায় ৯০টি মাদার ভেসেল রয়েছে।

রোজা উপলক্ষে খাদ্যশস্য এবং রাশিয়ার মজুদ ছাড়ার কারণে এক সঙ্গে অনেক জাহাজ চলে এসেছে। ঘন কুয়াশার কারণে রাতে কাজ ব্যাহত হওয়া এবং ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের কারণে পণ্য খালাস ধীর হচ্ছে। সরকার যথাসময়ে সারের ব্যাগ সরবরাহ করতে না পারায় সারের জাহাজগুলো সময়মতো খালাস হতে পারছে না। সংকট নিরসনের একমাত্র পথ হলো আমদানিকারকদের হাতে থাকা জাহাজগুলো দ্রুত খালাস করা। এ ছাড়া বন্দর বা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এক্ষেত্রে খুব বেশি কিছু করার নেই।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.