চন্দনাইশ: পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে গেলেন রেঞ্জার ইমরুল,আধমরা পাহাড়ের কলংক মনোয়ারের ঘাড়ে
৩০টি ইটভাটার নেই ছাড়পত্র,প্রকাশ্যে পুড়ছে বনের কাঠ-
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চন্দনাইশে অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ।
চন্দনাইশের বুকে অবৈধ ইটভাটার ছড়াছড়ি,৩০টি ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র আছে মাত্র ২টির। প্রায় সব ভাটার কার্যক্রমই বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধভাবে।
অবৈধ এসব ইটভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ।ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল। হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ।
নিত্যদিন এসব ইটভাটায় বনের কাঠ পোড়ালেও স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চলতি মৌসুমে কোন অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়নি।
অথচ পার্শ্ববর্তী উপজেলা সাতকানিয়া ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ ভাটা বন্ধে ও নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
সম্প্রতি চন্দনাইশে মাটি কাটার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান চোখে পড়লেও চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত অবৈধ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়নি।
ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধে বনবিভাগ থেকেও নেয়া হচ্ছে কোন পদক্ষেপ। ফলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এসব অবৈধ ভাটার মালিকরা।
ইট পোড়ানোর জ্বালানী হিসেবে নির্দিধায় উজাড় করে ফেলছে ভাটার পার্শ্ববর্তী বনের কাঠ।আবার এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলও রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন ও ইট পোড়ানো নিষিদ্ধ।
তবে এ আইন মানা হয়নি চন্দনাইশে। অধিকাংশ ইটভাটাই গড়ে তোলা হয়েছে পাহাড়ের আশেপাশেই। যাতে ইট তৈরীতে পাহাড়ের মাটি ও ইট পোড়াতে বনের কাঠ সহজেই ব্যবহার করা যায়।
সরেজমিন গত শুক্রবার উপজেলার কাঞ্চননগর রেলস্টেশন সংলগ্ন কেবিএম ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, ভাটার চারপাশে বিশাল বিশাল কাঠের স্তুপ।
আইনে কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ হলেও ইট পোড়ানের জ্বালানি হিসেবে স্তূপ করে রাখা হয়েছে এসব কাঠ। অথচ জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে স্থাপন করা এসব ভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করার কথা। এলাকাবাসীর শঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে চন্দনাইশের বনাঞ্চল।এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে শুধু কেবিএম ইটভাটাই নয়, ৩০টি ভাটার মধ্যে জিগজ্যাগ কয়েকটি ভাটা বাদে প্রায় সব কটি ভাটাতেই ইট পোড়াতে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে।
অথচ ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, ইট পোড়ানোর ক্ষেত্রে জ্বালানি কাঠের ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি। চন্দনাইশের এসব বয়লার ভাটায় মানা হচ্ছেনা কোন ধরনের আইন।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, বনের কাঠ ইটভাটায় ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। যা অবৈধ ইটভাটা এবং আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে চলছে।
এতে বায়ু দূষণ, বন উজাড়, কৃষি জমির ক্ষতি এবং
জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনের
নজরদারি ও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে এই
প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।কয়লার উচ্চমূল্য ও সহজলভ্যতার অভাবে ভাটা মালিকরা কাঠ ব্যবহার করছে, যা পরিবেশ ও মানুষের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভাটা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর টনপ্রতি কয়লা ক্রয় করা হচ্ছে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকায়।অপরদিকে প্রতি টন কাঠের দাম পড়ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।কয়লার তুলনায় দাম কম হওয়ায় বনাঞ্চলের কাঠকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে ভাটা মালিকরা। ইট পোড়ানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানায়, প্রতিটি ভাটায় ইট পোড়াতে দিনরাত ৬ থেকে ৭ টন কাঠের প্রয়োজন হয়।
এসব কাঠের অধিকাংশই যোগান দেয়া হচ্ছে দোহাজারী রেঞ্জের আশেপাশের স্থানীয় বনাঞ্চল থেকে।স্থানীয়রা জানান, প্রতি রাতেই ট্রাকে ট্রাকে বনের কাঠ যায় এসব ইটের ভাটায়। চন্দনাইশ ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম বাদশা একটি গণমাধ্যমকে বলেন,সমিতির প্রত্যেককে বলা আছে ইট পোড়ানোতে জ্বালানি হিসেবে বনের কাঠ ব্যবহার করা যাবে না।তিনি জানান, চন্দনাইশে মোট ৩০টি ইটভাটার য়েছে। যার মধ্যে একটি বন্ধ। বাকি ২৯টি ভাটার
মধ্যে জিগজ্যাগ ভাটার সংখ্যা ২৪টি। আর বাকি ৫টি বয়লার ভাটা।
লাইসেন্স পাওয়ার ব্যাপারে সবগুলো ভাটা থেকে আবেদন জমা দেয়া আছে।কিছু আইনি জটিলতার কারণে এখনো লাইসেন্সপাওয়া হয়নি।
বনের কাঠ পোড়ানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, জিগজ্যাগ করা কিছু কিছু ইটভাটায় পূর্ণাঙ্গ কোন টেকনিশিয়ান না থাকায় কয়েকটি ইটভাটার সামনে ২০ থেকে ৫০ মণ কাঠের লাকড়ি রাখা হয়। এছাড়া প্রতিটি ভাটায় কম করে হলেও ২০০ জনশ্রমিক কর্মরত থাকে, তাদের রান্নাবান্নার কাজেও কাঠগুলো ব্যবহার হয়।
বনের কাঠ পোড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীন দোহাজারী রেঞ্জের রেঞ্জার মনোয়ার ইসলাম জানান, তিনি গত ১৮ জানুয়ারি দোহাজারী রেঞ্জে যোগদান করেছেন। অবৈধ ইটভাটায় বনের কাঠ পোড়ানের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে বনবিভাগের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।এবং তিনি চট্টগ্রাম ডিভিশনেও নতুন, তেমন জানাশোনা নেই।তবে আমি কথা দিচ্ছি সকল প্রকার অনিয়ম দূর করা হবে ইনশাআল্লাহ।
চন্দনাইশের অবৈধ ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাজিব হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সিডিউল দেয়া থাকে।
সিডিউল অনুযায়ী ইতিমধ্যে কয়েকটি উপজেলায় অভিযান চালানো হয়েছে। চন্দনাইশেও অবৈধ ইটভাটা বৃদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। বিনা বাঁধায় কাঠ পোড়ানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, যেসব ভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ করে খুব শিঘ্রই অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে এদিকে অনেক ইটভাটায় মূলত লাকড়ী ব্যবসা করেন খোদ ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বাদশা।
৫ই আগষ্ট ২০২৪ এর আগে তার একটি ইটভাটা থাকলেও এখন ৪টি ইটভাটার মালিক বলে জানিয়েছেন তারই সমিতির একাধিক সদস্য।
বিগত সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী নজরুল ইসলামের বদান্যতায় ইটভাটা মালিকের গুরুত্বপূর্ন পদ উপভোগ করলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ইটভাটারও নিয়ন্ত্রণ নেয় এই বাদশা।
বাদশার ভয়ে উপজেলা প্রশাসন কখনো তার মালিকানাধীন ইটভাটায় প্রবেশ করেননা বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইটভাটা মালিক চট্টগ্রাম সংবাদকে জানিয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রাম সংবাদকে এক ইটভাটার মালিক জানিয়েছেন তারা সাবেক দোহাজারী রেঞ্জ বন কর্মকর্তা ইমরুলকে ম্যানেজ করেই এবং চন্দনাইশ উপজেলা প্রশাসনকেও মৌসুম ভিত্তিক প্রতিভাটা থেকে একটা চাঁদা তোলে এই কাজকর্ম চালাচ্ছেন।এদিকে ইটভাটায় লাকড়ি দেয়া এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম সংবাদকে জানান,সাবেক রেঞ্জার ইমরুল সাহেব সব জানে তবে নতুন একজন মনোয়ার ইসলাম নামে আসছে ওনাকে আমরা চিনিনা,নতুন রেঞ্জার আসাতে একটু আমাদের ব্যবসায় সমস্যা হবে।
কিছু কিছু সাংবাদিকও তাদের হাতে আছেন বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইটভাটার মালিক।
সৈ/আ/উ