চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) সংসদীয় আসনে মোটরসাইকেল প্রতীক এখন আর শুধু একটি নির্বাচনী চিহ্ন নয়—এটি ত্যাগ, সংগ্রাম ও দুঃসময়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে। দীর্ঘ ১৬–১৭ বছরের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মধ্যেও যারা রাজপথে থেকেছেন, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই মোটরসাইকেল প্রতীককে দেখছেন অনেকে।
গতকাল ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাত ৮টায় চট্টগ্রাম-১৪ আসনের পুরানগড় ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে মোটরসাইকেল প্রতীকের সমর্থনে এক উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোটরসাইকেল মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী সিআইপি। প্রধান বক্তা ছিলেন মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক এডভোকেট রিদোয়ানুল হক। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি নেতা খোরশেদ আলম ফারুক সওদাগর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ছাত্রদল নেতা রাজিব হোসেন ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রমজান।
বৈঠকে বক্তব্য রাখেন যুবদল নেতা মোহাম্মদ আলমগীর সাকিব, উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ফৌজুল কবির রুবেল, উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, ছাত্রদল নেতা জয়নাল আবেদিন মানিক, বাজালিয়া অলি আহমদ কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হাসিব, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মমতাজ, নিদর্শন বড়ুয়া নিপুন, আবদুল মালেক, মফিজুর রহমান, আলমগীর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য মনির আহমদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আজিজুল হাসান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা মোহাম্মদ মোস্তাক, ইলিয়াছ ছাকী, বাজালিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আরিফ, যুবদল নেতা রাশেদুল ইসলাম, শিল্পী নুরুল আবছার, আবদুল কাদের ড্রাইভার, ওবাইদুল হক, নাছির উদ্দিন, মোহাম্মদ আনোয়ারসহ আরও অনেকে।
উঠান বৈঠক থেকে ত্যাগী নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয় এবং মোটরসাইকেল প্রতীকের পক্ষে ঘরে ঘরে গণসংযোগ জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বলেন,বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে যারা সবচেয়ে দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—সেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের আজ যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দলীয় বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে যারা সুবিধাভোগী ছিলেন কিংবা নীরব ভূমিকা পালন করেছেন, আজ তারাই নতুন মুখ হিসেবে সামনে চলে আসছেন। এতে দলের ভেতরে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয় পর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মতে, বিগত ১৫–১৬ বছর বিএনপির জন্য ছিল চরম দুঃসময়ের অধ্যায়। সেই সময়ে অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অনেকেই পরিবার-পরিজন ছেড়ে আন্দোলনে থেকেছেন, চাকরি হারিয়েছেন, কেউ কেউ দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকেছেন। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই ত্যাগী কর্মীদের পেছনে ঠেলে দিয়ে নতুন নতুন মুখকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—যাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্নভাবে সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ত্যাগী নেতা বলেন, “আমরা যখন রাজপথে মার খেয়েছি, জেল খেটেছি, তখন অনেকেই ঘরে বসে ছিলেন বা সুবিধা নিয়েছেন। অনেকে সরাসরি আওয়ামী লীগ এর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমাদের কে হামলা ও মামলা দিয়ে নির্যাতন করেছেন।আমরা যখন নির্বাচন বর্জন করি-তখন তারা নিজেরাই নির্বাচন করেছেন।আজ তারাই প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। তারাই বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে আমাদেরকে ধানেরশীষের গল্প শুনাচ্ছেন।এটা চলতে থাকলে দলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।”
নেতাকর্মীরা মনে করেন, ত্যাগ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে অবমূল্যায়ন না করলে মাঠপর্যায়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো ত্যাগী কর্মীরা। তাদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের সামনে আনা হলে কর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে বা আরো হবে।যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াইকে কঠিন করে তুলবে।
একাধিক বক্তা ও দলীয় পর্যবেক্ষক বলেন, বিএনপি একটি গণআন্দোলনের দল। এই দলের শক্তি এসেছে রাজপথের সংগ্রাম থেকে, সুবিধাবাদ থেকে নয়। দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে যদি শুধুমাত্র নতুন মুখ ও সুবিধাভোগীদের ওপর নির্ভর করা হয়, তবে দল সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সাধারণ কর্মীদের আস্থা হারাবে।
তারা আরও বলেন, এখনই যদি দলীয়ভাবে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করে তাদের যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব দেওয়া না হয়, তাহলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এতে শুধু নির্বাচনী রাজনীতি নয়, আন্দোলন-সংগ্রামও দুর্বল হয়ে পড়বে।
দলীয় স্বার্থে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে নেতাকর্মীরা বলেন, “ত্যাগের স্বীকৃতি ছাড়া কোনো দল দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। বিএনপিকে শক্তিশালী করতে হলে দুঃসময়ের সৈনিকদেরই সামনে আনতে হবে।”