মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত শিশু হুজাইফার মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে মাথায় গুরুতর আহত টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯) আর বেঁচে নেই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ২৭ দিন পর আজ শনিবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিশুটি দীর্ঘদিন ধরে সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। একাধিকবার তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। তবে মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে সৃষ্ট জটিলতায় শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ১১ জানুয়ারি সকালে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় হুজাইফা। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার অবস্থার অবনতি হলে সেদিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ সে সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গুলিটি শিশুটির মস্তিষ্কে প্রবেশ করায় তার অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করলেও ঝুঁকির কারণে মস্তিষ্কে ঢুকে যাওয়া গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার আশায় শিশুটিকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

হুজাইফার চাচা মোহাম্মদ এরশাদ জানান, গত ১০ জানুয়ারি শনিবার রাতভর সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির শব্দে হোয়াইক্যংসহ আশপাশের এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রোববার সকালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হওয়ায় শিশুটি বাড়ির পাশে খেলতে বের হয়।

ঠিক সেই সময় আবারও সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি শুরু হলে একটি গুলি এসে তার মাথায় লাগে। গুলির শব্দে লোকজন
ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হুজাইফা ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও মেধাবী শিশু। তার বয়স অনুযায়ী পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও আগ্রহ ছিল। তার আকস্মিক মৃত্যু পরিবার ও এলাকাবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মংডু টাউনশিপ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী বিমান হামলা, ড্রোন হামলা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ জোরদার করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত গোলার শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে বসতঘর, চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে। এতে নারী ও শিশুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার রাতে ঘুমাতে পারছে না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।হুজাইফার মৃত্যু সীমান্তে বসবাসরত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা জোরদার না করা হলে এ ধরনের প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।

শিশুটির মৃত্যুর খবরে হোয়াইক্যংসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা সীমান্ত এলাকায় বেসামরিক মানুষের জীবন সুরক্ষায় সরকারের জরুরি ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি আরো বলেন পরিবারের মধ্যে শোকের মাতম চলছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.