চট্টগ্রাম স্বাধীনতা বইমেলা ২০২৬: প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার সমন্বিত আয়োজন

 

আলী প্রয়াস

বই মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারের প্রধান আধার। একটি জাতির চিন্তা, মনন, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার হলো বই। বই মানুষের চেতনা জাগ্রত করে, যুক্তিবোধ তৈরি করে এবং মূল্যবোধ গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে।

 

আর এই বইকে কেন্দ্র করে যে বৃহত্তম সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলনমেলা গড়ে ওঠে, সেটিই বইমেলা। বইমেলায় প্রকাশকরা শুধু বই কেনাবেচা করে এমন নয়; এটি চিন্তার আদান-প্রদান, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর সম্প্রসারণের অনন্য ক্ষেত্র।

একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মননশীল জাতি গঠনে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। লেখক তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দেন, প্রকাশক সেই চিন্তাকে সুশৃঙ্খলভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন, আর পাঠক সেই জ্ঞানকে গ্রহণ করে সমাজে বাস্তবায়ন করেন।

 

এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কই একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার ভিত্তি তৈরি করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বইমেলা শুধু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র নয়, এটি সামাজিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।

 

চট্টগ্রামে বইমেলার ঐতিহ্য, প্রেক্ষাপট ও প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে এটি শুধু একটি আঞ্চলিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর বইমেলা তথা জাতীয় পর্যায়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

 

আগামী ৩১ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ‘স্বাধীনতা বইমেলা ২০২৬ ‘একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আয়োজন। এটি জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সংহতির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এবারের বইমেলার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।

 

রমজান মাস এবং সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে এবছর জাতীয় পর্যায়ের অমর একুশে বইমেলা যথাসময়ে ঢাকায় আয়োজন করা সম্ভব হয়নি; রমজান মাসে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে।

ফলে ঢাকার একুশে বইমেলা প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

প্রকাশকরা আশানুরূপ বিক্রি করতে পারেননি, পাঠকদের উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলক কম।

 

রমজানের কারণে বইমেলার মতো একটি প্রাণবন্ত আয়োজনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাঠকদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় লেখক-প্রকাশক—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রামে অত্যন্ত সচেতনভাবে একুশের বইমেলা আয়োজন থেকে সরে এসে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বইমেলা এটি সময়োপযোগী একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। নির্বাচন ও রমজান-পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, তখন একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রতি আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

 

যদিও স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে বইমেলা ফেব্রুয়ারিতেই হওয়া যুক্তিযুক্ত ও উত্তম। তবুও সময়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নতুন নাম ও নতুন প্রেক্ষিতে এই আয়োজনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ফলে ৩১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিননেশিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিতব্য এই স্বাধীনতা বইমেলাকে ঘিরে প্রত্যাশা অনেক বেশি।

 

চট্টগ্রামের বইমেলা বিগত কয়েক বছরে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় এই মেলা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আমি প্রকাশ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিগত সময়ে মেলার যুগ্ম-আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে এসেছি।

 

লেখক, পাঠক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ ও সমন্বিত প্রয়াসের ফলে বইমেলাটি আজ একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে ও সৃজনশীল মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।

 

স্থানীয় লেখকদের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে মেলাটি পেয়েছে বহুমাত্রিকতা। ফলে চট্টগ্রাম এখন বন্দরনগরীর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।
রমজান ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ সাধারণত কিছুটা সংবেদনশীল থাকে।

 

এই প্রেক্ষাপটে একটি সৃজনশীল সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে বইমেলা মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও চিন্তার বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বইমেলা এমন একটি জায়গা, যেখানে ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে। ফলে স্বাধীনতা বইমেলা হতে পারে এক ধরনের সামাজিক পুনর্মিলনের প্ল্যাটফর্ম।

 

এই মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা। লেখকদের জন্য বইমেলা শুধু বই প্রকাশের জায়গা নয়, বরং পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি অনন্য সুযোগ।

 

তারা তাদের সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিক্রিয়া জানতে পারেন, নতুন ধারণা লাভ করেন এবং সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারেন। বিশেষ করে তরুণ লেখকদের জন্য এটি আত্মপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

 

পাঠকদের জন্য বইমেলা একটি উৎসবের নাম। এখানে তারা নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন, প্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান এবং নানা ধরনের সাহিত্য ও জ্ঞানভিত্তিক বই সংগ্রহ করতে পারেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেখানে মানুষের পাঠাভ্যাস কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে বইমেলা পাঠের প্রতি আগ্রহ পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে প্রকাশকদের জন্য এই মেলা ব্যবসায়িক ও সৃজনশীল উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

 

তারা নতুন বই প্রকাশ, বাজার সম্প্রসারণ এবং পাঠকের চাহিদা বোঝার সুযোগ পান। চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সক্রিয় ভূমিকা এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তুলেছে। প্রকাশনা ব্যবস্থাপনা, স্টল বরাদ্দ, বইয়ের মান নিশ্চিতকরণ—সবকিছুতেই তাদের দক্ষতা মেলার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।

২০১৯ সাল থেকে এই অভিন্ন আয়োজনের সফল বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়রের আন্তরিকতা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সার্বিক লজিস্টিক সাপোর্ট মেলাকে একটি সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল রূপ দিতে সহায়তা করে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা—এসব বিষয় মেলার সার্বিক সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

 

মেলার সাফল্য ও সার্থকতা নির্ভর করে এর অংশগ্রহণমূলক চরিত্রের ওপর। লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ—সবার সমন্বয়ে এই আয়োজন একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়।

 

এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণই মেলাকে শুধু বই কেনাবেচার জায়গা থেকে একটি প্রাণবন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করে।

এবারের বইমেলা ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে, যার মধ্যে ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হবে। ফলে বইমেলায় একটি বাড়তি উৎসবের আমেজ যুক্ত হবে। নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতি মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে।

 

তবে এই সময়টিতে বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ার একটি সামান্য আশঙ্কা থাকে, যা আয়োজকদের বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিষয়ভিত্তিক আলোচনাসভা ও সেমিনার এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এখানে বিভিন্ন দিবস উদযাপন করা হয়—রবীন্দ্র-নজরুল, আদিবাসী সংস্কৃতি, চট্টগ্রামের লোকসংগীতসহ নানা বিষয়ভিত্তিক আয়োজন থাকে। এসব অনুষ্ঠান জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ফেব্রুয়ারিতে না হওয়াতে দর্শনার্থীর উপস্থিতি কিছুটা সীমিত হতে পারে, আবার আবহাওয়া ও অন্যান্য বাস্তবিক সমস্যাও থাকতে পারে।

 

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আয়োজকদের সৃজনশীল ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অনলাইন প্রচারণা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেলার আপডেট প্রদান, বিশেষ ছাড় বা অফার ঘোষণা, নিরাপত্তা, এবং দর্শনার্থীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই মেলা নিঃসন্দেহে সফল হবে।

 

বিশেষ করে সন্ধ্যাকালীন কার্যক্রম, নিরাপদ পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

 

চট্টগ্রামের স্বাধীনতা বইমেলার মতো চমৎকার আয়োজন এতদঞ্চলের মানুষকে মননশীল ও সৃজনশীল সুচিন্তায় সম্পৃক্ত করবে। এই আয়োজন—বই ও জ্ঞানচর্চার প্রতি মানুষের ভালোবাসা অটুট রাখবে। সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিক উদ্যোগ এবং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এই মেলা নিঃসন্দেহে সফল ও সার্থক হবে। এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.