চট্টগ্রাম ​কাস্টমস হাউসে ঘুষ বাণিজ্য, রাজস্ব ফাঁকির ধুম

কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও আটকানো যায়নি অবৈধ চালান!

এস. এম. পিন্টু 

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কতিপয় কর্মকর্তার ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ঘুষের পরিমানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় রাজস্বের পরিমান। এমনকি ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ চালনও পার পেয়ে যায় সহজে। আবার ঘু না দিলে পদে পদে হয়রানির শিকার হন নিরিহ সৎ ব্যবসায়ীরা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দাখিলকৃত একটি আমদানিকৃত পণ্যের চালানের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট পাচারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। ঢাকার ‘নাজমুল এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এই জালিয়াতির সাথে জড়িত। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো— এই অবৈধ আমদানির বিষয়টি কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগে থেকেই জানতেন। এমনকি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো ‘মোটা অঙ্কের’ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে পণ্য চালানটি খালাস করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে সি-১৩৬৭৫৩২ নম্বর বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে কাস্টমস হাউসে একটি পণ্যের চালান সাবমিট করা হয়। কাগজপত্রে চালানটিতে ১০০২ কার্টন ম্যাসাজার, মিনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, নাইফ, স্প্রেয়ার নজল, রেঞ্চ, হেয়ার স্ট্রেইটনার, নেইল কাটার, আইব্রো ক্লিপ, কাঁচি, কি-রিং, প্লাস্টিক ও গ্লাস বিডস আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বৈধ পণ্যের আড়ালে কৌশলে নিয়ে আসা হয় আরও ৫০০ কার্টন অবৈধ সিগারেট।

​সূত্র জানায়, এই অবৈধ সিগারেট আমদানির তথ্য কাস্টমস হাউসের কমিশনার জাকির হোসেন এবং রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) আসাদুজ্জামান আগে থেকেই অবগত ছিলেন। ২০ জুলাই চালানটি কাস্টমস সিস্টেমে সাবমিট করার পরপরই রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে তথ্যপ্রমাণসহ একটি তথ্যবার্তা (মেসেজ) পাঠানো হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী, এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর পণ্য চালানটি ‘ইনস্পেকশন ট্র্যাক্ট’ বা কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক লক বা আটক করার কথা। কিন্তু কাস্টমসের এই কর্মকর্তা রহস্যজনক কারণে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

​অভিযোগ রয়েছে, পণ্যটি আটক না করার পেছনে পর্দার আড়ালে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে জালিয়াতির এই চালানটি বিনা বাধায় খালাস হওয়ার সুযোগ করে দেন। এর ফলে সরকার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অপর একটি সূত্র জানায়, পতিত সরকারের প্রভাবশালী এমপি দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের তিনটি কন্টেইনার মদ সিগারেট এর তথ‍্য দিলেও আসাদ তা আটক না করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পণ‍্য চালান ছাড় করছে।

​এ বিষয়ে জানতে চট্রগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারমুহা. মাহবুবুর রহমানের ল্যান্ড ফোনে ও সংশ্লিষ্ট রেভিনিউ অফিসার (আরও) মো. আসাদুজ্জামান খানের মোবাইলে কল দিলেও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা যায়নি। তবে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়ার পরও কেন চালানটি আটক করা হলো না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি উঠেছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.