নির্যাতনের অভিযোগ ছিল নিছক গুজব, কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম 

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের নেতা নুরুল আলমের মৃত্যুকে ঘিরে নানা আলোচনা ও অভিযোগ উঠলেও তার শরীরে কোনো ধরনের আঘাত বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।

 

কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে জেলা পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে থানায় নেওয়া, আদালতে সোপর্দ, কারাগারে পাঠানোসহ প্রতিটি ধাপে আইন অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং কোথাও কোনো নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম কালবেলাকে বলেন, নুরুল আলমকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি জানান, কারাগারে তার মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে কোনো ধরনের আঘাত, জখম বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাতকানিয়া এলাকায় নাশকতার পরিকল্পনার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়। ওই দিন দুপুর সোয়া ১২টায় সাতকানিয়া উপজেলার ৮ নম্বর ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা এলাকার নাসিম মাস্টারের বাড়ি থেকে ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলমকে (৩৫) আটক করা হয়। তিনি উত্তর ঢেমশা গ্রামের এবার হোসেন ও নূরজাহান বেগমের ছেলে। আটকের পর তাকে সাতকানিয়া থানায় নেওয়া হয় এবং জিডি নম্বর-১১০২ অনুযায়ী প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। পরে সাতকানিয়া থানার ২০২৪ সালের একটি হত্যাচেষ্টা, অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে আদালতে সোপর্দ করা হয়। জিডি নম্বর-১১০৫ অনুযায়ী দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে তাকে আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালতের নির্দেশে ওই দিন বিকেলেই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা যায়, ২৩ জুন বিকেলে নুরুল আলমকে আমদানি ওয়ার্ডে রাখা হয়। পরদিন সকালে বন্দি গণনার সময় হঠাৎ নুরুল আলম অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারের হাসপাতাল ইউনিটে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় রক্তচাপ অস্বাভাবিক পাওয়া গেলে দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কারাগারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতার মৃত্যু

কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ৬টা ৪৭ মিনিটে অসুস্থ অবস্থায় নুরুল আলমকে অন্য বন্দি ও কারারক্ষীদের সহায়তায় হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে আগের দিন অর্থাৎ ২৩ জুন তার কারাগারে প্রবেশের সময়ের ফুটেজে দেখা যায়, নুরুল আলম স্বাভাবিকভাবে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং তল্লাশির সময় কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যার লক্ষণ ছিল না। এ ছাড়া আদালতে হাজির করার সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে হাসিমুখে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠতে দেখা যায়।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘গ্রেপ্তারের সময় বা থানায় অবস্থানকালে নুরুল আলম অসুস্থ ছিলেন—এমন কোনো তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। আদালতে পাঠানোর আগেও তিনি কোনো ধরনের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানাননি। সাতকানিয়া থানা ও কারাগারে প্রবেশের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে তাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে দেখা গেছে। কারাগারেও নিরাপত্তা তল্লাশির সময় তিনি দুই হাত উপরে তুলে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন এবং কোথাও তাকে অসুস্থ বা দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়নি।’

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কারাগারে প্রবেশের সময় নুরুল আলম কোনো ধরনের অসুস্থতার কথা জানাননি। বুধবার সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয় এবং পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

এদিকে নুরুল আলমের মৃত্যু ঘিরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে এবং নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

নুরুল আলমের ভাই নূর মোহাম্মদ গণমাধ্যমে দাবি করেন, ঘটনার দিন সাতকানিয়া ভূমি অফিসে জমি-সংক্রান্ত শুনানিতে গেলে সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়। নুরুল আলমের বিরুদ্ধে আগে থেকে কোনো মামলা ছিল না এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। নুরুল আলম রিয়াজউদ্দিন বাজারে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘পুরো গ্রেপ্তার ও আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের অনিয়ম বা নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনের উপস্থিতিতে প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে কোনো আঘাত বা নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা রুজু করা হয়েছে এবং মামলার বাদী হয়েছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.