সিআরবি ইস্যু: এক চিঠিতেই বেকায়দায় রেলওয়ে, গ্রহণই করলো না চট্টগ্রাম ওয়াসার সেই চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক>

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ওয়াসার চিঠিকে আমলে নিলো না। ধৃষ্ঠতা দেখিয়ে সোমবার পাঠানো ওয়াসার এই চিঠি গ্রহণ করেনি রেলওয়ের কর্মকর্তারা। এতে বোঝা গেল, এই চিঠি গ্রহণ করলে কিছুটা বিপাকে পড়তে হবে রেলওয়েকে, হতে হবে বিব্রতও। অনেকটা বেকায়দায়ও পড়তে পারে চট্টগ্রামের সিআরবিতে পরিবেশ ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণে ‘জেদ’ দেখানো রেলওয়েকে।

বলছিলাম সোমবার (২ আগস্ট) নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের প্রতিনিধিদের চিঠির প্রেক্ষিতে রেলওয়েকে দেওয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার চিঠির কথা। যে চিঠিতে কিছুটা কৌশলী হয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা রেলওয়েকে আইনী বেড়াজালে ফেলেই বাগড়া দিল সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নলকূপ স্থাপনে। সরকারী সংস্থা হয়ে রেলওয়ে যে আইন মানেনি সে বিষয়টি ‘আঙ্গুল’ দিয়ে দেখিয়ে দিল সংস্থাটি।

তবে অনুমোদন না নেওয়ায় রেলওয়ের এই প্রকল্পে নলকূপ স্থাপন কাজ সরাসরি বন্ধ করেনি ওয়াসা। এ প্রসঙ্গে রেলওয়েকে দেওয়া চিঠিতে ওয়াসা আইনের ধারা উল্লেখ করে বলেছে, ওয়াসাকে লাইসেন্স ফি জমা দিয়ে নলকূপ স্থাপনের অনুমতি নিতে হবে।

প্রথমে রেলওয়ের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালকের কাছে এই চিঠি পাঠানো হয়। তিনি এই চিঠি নেননি। পরে ওয়াসার কর্মকর্তারা এই চিঠি নিয়ে গেলেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে। তার দুয়ার থেকেও ফিরিয়ে দেওয়া হল চিঠি হাতে নিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতিনিধিদের।

এই আচরণ দেখে ওয়াসা কর্তৃপক্ষও কম যান না। তারা সোমবার বিকেলেই এই চিঠি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ের কাছে। ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সংবাদকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ড সদস্য মহসিন কাজী চট্টগ্রাম সংবাদকে বলেন, ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের রোববারের দেওয়া অভিযোগ পেয়েই ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সরেজমিন তদন্ত করে দেখেছে, অবৈধভাবেই রেলওয়ে হাসপাতাল প্রকল্প এলাকায় দুই ইঞ্চির চেয়ে বেশি ব্যাসার্ধের পাইপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কাজ করছে। এর প্রেক্ষিতে ওয়াসা সোমবার দুপুরে সিআরবিতে রেলওয়ের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায়। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক এই চিঠি গ্রহণ করেননি। এরপর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছেও ওয়াসার চিঠি নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তিনিও এই চিঠি গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এই চিঠি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠিয়েছে তাদের কাছে। রেলওয়ের কর্তৃপক্ষ এই আচরণ চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ। একটি সংস্থা আরেকটি সংস্থাকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চিঠি দিয়ে থাকে। ওয়াসা কোনো অন্যায় কিছু করেনি। চিঠি দিয়েছে লাইসেন্স গ্রহণের বিষয়ে। রেলওয়ের অফিসাররা আইনের ঊর্ধ্বে নন। তারা এই আচরণ দেখিয়ে সরকারের আইনকানুনের প্রতিও ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে।’

এর আগে রোববার (১ আগস্ট) নগরের ফুসফুস খ্যাত সিআরবিতে অনুমোদনহীন নলকূপ স্থাপন বন্ধ করতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচলককে (এমডি) অভিযোগ দিয়েছে ড. অনুপন সেনের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম।

এ সময় নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের ভাইস চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান, যুগ্ম সদস্যসচিব সাইফুল আলম বাবু, নির্বাহী সদস্য চৌধুরী ফরিদ, আলীউর রহমান, আমিন মুন্না, রাহুল দত্ত, তাপস পাপ্পু এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের অভিযোগ পেয়ে ২ আগস্ট ওয়াসার সিনিয়র সহকারী সচিব ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. দিদারুল আলম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সিআরবি’র বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়। এই চিঠিটির অনুলিপি দেওয়া হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককেও। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বরের পর চট্টগ্রাম ওয়াসার আওতাধীন এলাকায় নলকূপ স্থাপন করা হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১ আগস্ট চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব কর্মকর্তা-২ সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখেন, প্রকল্পে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য টেস্ট বোরিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। অথচ ওয়াসা থেকে নলকূপ স্থাপনের কোনো অনুমতি গ্রহণ করা হয়নি বা অনুমতির আবেদনও করা হয়নি। তাই নলকূপ স্থাপনের লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি পরিশোধ সাপেক্ষে চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে লাইসেন্স গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হল।

তবে এই চিঠি ২ আগস্ট রাত পর্যন্ত অফিসিয়ালি গ্রহণ করে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক।

এদিকে ওয়াসার চিঠিকে গুরুত্ব না দিয়ে রেলওয়ের এমন আচরণ ধৃষ্ঠতা হিসেবেই দেখছে চট্টগ্রাম সিআরবি হাসপাতাল বিরোধীরা। তারা বলছেন, রেলওয়ে সাধারণ জনগণের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে পরিবেশ ধ্বংস করে এই বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণ ঠেকানো হবে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব ও নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের যুগ্ম সদস্য সচিব মহসিন কাজী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনের নেতৃত্ব চট্টগ্রামবাসী আজ আন্দোলনে নেমেছে পরিবেশ রক্ষায়, তথা প্রজন্মের জীবন রক্ষায়। আর রেলওয়ে নেমেছে চট্টগ্রামের মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে। রেলওয়ের ডিজি এক ধরণের বক্তব্য দিচ্ছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম দিচ্ছে আরেক ধরণের বক্তব্য। তাদের এসব তালবাহানা চট্টলাবাসী মেনে নিবেনা। শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সিআরবিকে ধংস করে এই হাসপাতালের নামে অবৈধ বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের আয়োজন বন্ধ করা না হলে চট্টলাবাসী কঠোর আন্দোলনের ডাক দিবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.