দরিদ্র শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দ বাইসাইকেল নাতিকে দিলেন জামায়াত নেতা

 

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিশেষ বরাদ্দের সামগ্রী বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থে কেনা বাইসাইকেল, ছাগল, স্প্রে যন্ত্র, সেলাই মেশিন, ফুটবল ও হুইলচেয়ার প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে না পৌঁছে বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের স্বজনদের মধ্যে বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে।

gnewsদৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম। জানা গেছে, তিনি এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দ হওয়া একটি সাইকেল তিনি নিজেই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করে তুলে নিয়েছেন। সেই বাইসাইকেল তিনি নিজের নাতিকে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠলে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে অবশেষে বুধবার দুপুরে বাইসাইকেলটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন ওই জামায়াত নেতা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সাইমুন ইসলামের নামে একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র সাইমুনকে সেই সাইকেল না দিয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম নিজেই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করে সাইকেলটি তুলে বাড়ি নিয়ে যান। পরবর্তীতে সাইকেলটি তিনি নিজের নাতনিকে দিয়ে দেন।

ভুক্তভোগী মাদরাসাছাত্র সাইমুন ইসলাম জানায়, তার নামে বরাদ্দ হওয়া সাইকেলটি প্রথমে তাকে দেওয়া হয়নি। তার জন্মনিবন্ধনপত্র দিয়ে জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম বাইসাইকেলের বরাদ্দ নেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার তড়িঘড়ি করে বাইসাইকেলটি তার বাড়িতে পৌঁছে দেন জামায়াত নেতা।

শুধু জামায়াত আমিরই নন, বিএনপি নেতারাও বরাদ্দকৃত সাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্প্রে মেশিন নিজেদের স্বজনদের মাঝে বণ্টন করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা মাওলানা তাজুল ইসলাম প্রথমে দাবি করেন, সাইকেলটি তার প্রতিবেশী এক ছেলেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে পরক্ষণেই বক্তব্য বদলে তিনি বলেন—তার ছেলে বেকার এবং আর্থিক সংকটে থাকায় সাইকেলটি তার পুতনি মারিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। একই সাথে তিনি স্বীকার করেন, বরাদ্দকৃত এসব মালামাল জামায়াত ও বিএনপি নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

সরকারি মালামাল দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগি ও অনিয়মের এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে যা শোনা যাচ্ছে, এমন ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একটি খারাপ নজির সৃষ্টি করবে।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ যদি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এভাবে ভাগাভাগি হয়ে থাকে, তবে প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে এর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’

মাওলানা তাজুল ইসলামের এই কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ও সাবেক জামায়াত নেতা শের আলী।

তিনি বলেন, ‘মাওলানা তাজুল ইসলাম মোটেও কোনো দরিদ্র মানুষ নন। তিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। শহরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে। সন্তানরাও ভালো চাকরি করেন। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত বাইসাইকেল কৌশলে নিজের স্বজনকে দেওয়ার ঘটনা একজন দায়িত্বশীল মানুষের পক্ষে নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।’

কোটচাঁদপুর ইউএনও দীপা রানী সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘সাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সাইকেলটি ফেরত আনা হয়েছে। এটি নতুন করে প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাইসাইকেল ছাড়াও সেলাই মেশিন, ছাগল, স্প্রে মেশিন বিতরণেও কোনো অনিয়ম হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.