বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন বসবে ‘বেসরকারিভাবে’

প্রকাশিত: ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১

অনলাইন ডেস্ক: দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীসহ বিদেশগামী যাত্রীদের নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষার জন্য র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে সরকারি ভাবে নয়, প্রাথমিকভাবে এই র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপন করা হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে।

এই ল্যাবের পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ল্যাবের কারিগরি অংশের তত্ত্বাবধান করবে। বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপন হতে যাওয়া এই র‍্যাপিড পিসিআর নমুনা পরীক্ষার জন্য কত টাকা নির্ধারণ করা হবে সে বিষয়ে এখনো সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি আরব আমিরাত সরকারের নির্দেশনায় দেশের প্রায় ২০ হাজারের অধিক প্রবাসী বিপাকে পড়ে। দেশটির পক্ষ থেকে নির্দেশনা দিয়ে জানানো হয়- বিমানবন্দরে র‌্যাপিড পিসিআর টেস্টের ব্যবস্থা না থাকলে, সে দেশে নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারবেন না। এমন পাঁচটি দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশও।

আমিরাত এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়া এই তালিকায় আরও আছে— নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। এসব দেশের যাত্রীদের নিজ বিমানবন্দরে র‌্যাপিড পিসিআর টেস্টের ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে আরব আমিরাত ভ্রমণ সম্ভব নয়। দুবাইভিত্তিক এয়ারলাইন্সটির সর্বশেষ ট্রাভেল আপডেটে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

আগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কয়েকটি দেশের নাগরিকদের চলতি সপ্তাহে ভ্রমণ ভিসা, এন্ট্রি পারমিট দেওয়া শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এসব দেশ কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তাদের নাগরিকরাও দুবাই ভ্রমণের সুযোগ পাবেন– বলেও জানানো হয় এয়ারলাইন্সটির নির্দেশনায়।

এ কারণে তাই বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে আসছিল প্রবাসীরা। এমন অবস্থায় দেশের বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের জন্য নড়েচড়ে বসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ১ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিমানবন্দরে র‌্যাপিড আরটি-পিসিআর টেস্ট মেশিন বসানোর জন্য দু’টি কমিটি করে দেওয়া হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারিভাবে এখানে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপন করার বিষয়টি একটি দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া। আর তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রবাসীসহ বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা শনাক্তে নমুনা পরীক্ষার জন্য র‍্যাপিড-পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং এরিয়ায় জায়গা নির্ধারণ করেছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। তবে সরকারিভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে র‍্যাপিড পিসিআর ল্যাব স্থাপনের জন্য ন্যুনতম তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। তাই প্রবাসী কল্যাণ ও বিদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপন করতে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দু’একদিনের মধ্যে জাতীয় পত্রিকায় ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। যারা আবেদন করবেন, তাদের মধ্যে থেকে সক্ষমতা যাচাই করে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হবে।

এর আগে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের তিন বিমানবন্দরে আরটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনের নির্দেশনা দেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে তিনি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় (দেশ) এখন নতুন করে কন্ডিশন দেওয়া হচ্ছে যে, ফ্লাই করার চার থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর টেস্ট করতে হবে। বেশ কয়েকটি দেশ থেকে (এই শর্ত) দিয়েছে। সেজন্য গত কয়েক দিন থেকে আলোচনা চলছিল, আজকে এটা প্রিসাইজ করে দেওয়া হয়েছে—খুব দ্রুত দুই বা তিনদিনের মধ্যে এয়ারপোর্টেই একটা টেস্টিং ফ্যাসিলিটিজ করা। অন্যান্য দেশেও যেরকম আছে। যাতে ফ্লাই করার চার ঘণ্টার মধ্যে ওনারা টেস্ট করতে পারেন।

ঘোষণার পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ল্যাব স্থাপন বিষয়ে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনের জন্য সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন কমিটির একাধিক বৈঠক অনুষ্টিত হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপন বিষয়ে সোমবারের (৬ সেপ্টেম্বর) বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জানানো হয়েছে এই নমুনা পরীক্ষার মূল্য এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার হতে পারে। ল্যাব স্থাপনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় শুধু কারিগরি দিকটা দেখবো। অর্থাৎ যেসব নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে তা ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা ও যে মেশিনে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে তা ঠিকভাবে করছে কিনা সেগুলো দেখবে। একইসঙ্গে টেস্টের সেন্সভিটি ও স্পেসিফিটি ঠিক আছে কিনা তাও দেখবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন বসবে ‘বেসরকারিভাবে’

ল্যাবের জন্য জায়গা দিবে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপন করবে। একইসঙ্গে যে সব দেশে এ টেস্ট জরুরি ভিত্তিতে করা হয় তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় রেপিড আরটি পিসিআর মেশিন যোগাড় করবে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে বেসরকারিভাবে যে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিনের কথা বলা হচ্ছে সেটির নমুনা পরীক্ষার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। একটা মেশিনে প্রতি ৪৫ মিনিটে ছয় থেকে ১০টা পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারবে। আর তাই মেশিন লাগবে বেশি। এক্ষেত্রে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকেই মেশিন যোগার করা হবে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নমুনা পরীক্ষা মান ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইইডিসিআর, সিডিসি, ল্যাবরেটরি মেডিসিনকে মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারিভাবে এই মেশিন কিনতে হলে অন্তত তিন মাস লাগবে। আর তাই বেসরকারিভাবেই কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কয়টা মেশিন বসছে বা নমুনা পরীক্ষার মূল্য কত হতে পারে এগুলো টেকনিক্যাল কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দামের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এই ল্যাব স্থাপনের পরে মূলত প্রবাসীদের দুইবার নমুনা পরীক্ষা করাতে হবে। বিমান বন্দরে আসার পূর্বে একটি নমুনা পরীক্ষা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি আরটি পিসিআর ল্যাবে রুটিন টেস্ট আকারে করাতে হবে। এরপরে বিমানবন্দরে প্রবেশের পরে আবার র‍্যাপিড পিসিআর টেস্ট লাগবে যার ফলাফল জানাতে হবে চার ঘণ্টার মধ্যে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, দ্রুততম সময়ে নমুনা পরীক্ষার জন্য যে ধরণের পিসিআর মেশিন দরকার তা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আছে বলে কারো জানা নেই। সেক্ষেত্রে সরকারিভাবে দরপত্র আহ্বান করা হলে ন্যূনতম তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে ক্রয়াদেশ পাওয়ার জন্য। আর তাই দ্রুততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে (ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম) র‍্যাপিড পিসিআর ল্যাব স্থাপনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, ‘আমরা মোটামুটিভাবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকারিভাবে পিসিআর ল্যাব করতে যেহেতু এখন সময় লাগবে সেজন্য আমাদের কাছে যাদের যাদের প্রস্তাব আছে তাদের মধ্য থেকে সিলেকশন করে ল্যাব চালু করার একটা ব্যবস্থা করবো। আমি আশা করছি যে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে আমরা এই ল্যাব চালু করতে পারবো। একটু লিমিটেড হিসেবে হলেও চালু করতে পারবো।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অবশ্য তিনটা বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু এই সময়ে এই তিনটাতেই একসঙ্গে ল্যাবের প্রয়োজন নেই। তাই শুধুমাত্র ঢাকাতেই ল্যাব হচ্ছে। এটা শুধুমাত্র প্রয়োজন এই মুহূর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে এখন ফ্লাইট যাচ্ছে শুধুমাত্র ঢাকা থেকে। চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে কোনো ফ্লাইট যাচ্ছে না। তাই সেই দুইটা আমরা পরে দেখবো। আগে ঢাকাটা আমরা চালু করে নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিকভাবে বেসরকারিভাবে একটা ল্যাব করার পরিকল্পনা আছে। এক্ষেত্রে আমরা আগে শুরু করি এরপরে বুঝতে পারবো। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ নমুনা পরীক্ষা করার ডিমান্ড আছে। এক্ষেত্রে আমরা যখন কাজ শুরু করবো তখন বোঝা যাবে। এই পুরো বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ যারা আছে তারা তত্ত্বাবধান করবেন। তবে মূল তত্ত্বাবধান করবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।’