‘মানবিক’ শওকত শৃঙ্খলার প্রতি ‘অমানবিক’ হয়ে চাকরি হারালেন

চট্টগ্রাম ব্যুরো : রাস্তাঘাটে অযত্নে-অবহেলায় পড়ে থাকা ভাসমান মানুষদের চিকিৎসা ও সেবা দিয়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন পুলিশ কনস্টেবল শওকত হোসেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার মাহবুবর রহমান তার এই কর্মকাণ্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মানবিক পুলিশ ইউনিট’ গঠন করেছিলেন।

এরপর থেকে কনস্টেবল শওকত চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নপ্রান্তে ‍ঘুরে ঘুরে মানবিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা এনে সেই টাকায় গরিব লোকজনকে বিভিন্ন সহযোগিতা দেন। ফেসবুকে-ইউটিউবে মানবিক কর্মকাণ্ডের খবর প্রচার করে রীতিমতো ‘তারকা’ বনে যান। এর মধ্যে ওয়াজ মাহফিলে গিয়েও বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন, যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তাকে মানবিক পুলিশ ইউনিট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি ‘বেওয়ারিশ সেবা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করে জেলায় জেলায় এর শাখা গঠন করতে থাকেন।

এসব মানবিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে কনস্টেবল শওকত বিনা নোটিশে ৪২৪ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এর মধ্যে ৭১ দিন অবশ্য অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত ছিলেন বলে তার দাবি। সর্বশেষ দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও ‘চাকরিতে অনীহার কথা’ জানানোর পর তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে আলোচিত-সমালোচিত ‘মানবিক পুলিশ শওকত’ কাহিনীর ইতি হয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল সিএমপির বন্দর জোনের উপ-কমিশনার শাকিলা সোলতানা তার বরখাস্ত আদেশ স্বাক্ষর করেন। তবে শওকতের দাবি, তিনি নিজেই চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিতর্ক তৈরির ভয়ে কর্মকর্তারা সেই আবেদন গ্রহণ না করে তাকে চাকরিচ্যুত করেছেন।

সিএমপির উপ-কমিশনার (সদর) আব্দুল ওয়ারিশ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিএমপির বন্দর জোনে কর্মরত থাকা অবস্থায় শওকতের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছিল। কমিটিকে তিনি চাকরি করতে ইচ্ছুক নন বলে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল তার চাকরিচ্যুতির চূড়ান্ত আদেশ হয়েছে। এখন শওকত চাইলে আদেশের বিষয়ে তার অথরিটি হিসেবে সিএমপি কমিশনারের কাছে আবেদন করতে পারবেন।’

জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৮ আগস্ট শওকত হোসেন কনস্টেবল হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ডিএমপি, রাঙামাটি জেলা এবং রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সে প্রায় ১২ বছর চাকুরির পর ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর তার সিএমপিতে পদায়ন হয়। ওই বছরের ২ নভেম্বর তাকে সিএমপির দক্ষিণ বিভাগে পদায়ন করা হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।

২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নার্সিং ও প্যারামেডিক ডিপ্লোমাধারী শওকত চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত তার কর্মস্থল ছিল সিএমপির বন্দর বিভাগ।

শওকতের মানবিক কর্মকাণ্ডের বিষয় মূলত জানাজানি হয় সিএমপিতে পদায়নের পরে। শওকত তার ছয় সহকর্মীকে নিয়ে রাস্তায়-ফুটপাতে বেওয়ারিশ, অসুস্থ লোকজনকে বেছে বেছে চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করেন। তাদের জন্য চিকিৎসা, খাবার আর পোশাকেরও ব্যবস্থা করতে থাকেন। ২০১৯ সালে ২৮ নভেম্বর নগর পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভায় কনস্টেবল শওকত নিজেই তার এই মানবিক সেবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। বক্তব্য শুনে তখনকার সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান ‘মানবিক পুলিশ ইউনিট’ গঠন করেন।

স্বীকৃতি পেয়ে শওকতের কর্মকাণ্ড আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার কর্মকাণ্ডের খবর ফলাও করে প্রচার হতে থাকে। এর মধ্যে ‘আরজে কিবরিয়া’ নামে একজন ইউটিউবার কনস্টেবল শওকতের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করেন। সেটি ফেসবুকে-ইউটিউবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে রীতিমতো তারকা বনে যান শওকত। এরপর থেকে তিনি স্বজনহীন রোগীদের সেবার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে গরীব-অসহায়দেরও সহযোগিতা শুরু করেন এবং সেগুলো ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার হতে থাকে।

বিভিন্ন রেডিও, টেলিভিশনে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা সভায় তার ডাক আসতে থাকে। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি নগরীর দেওয়ানহাট এলাকায় একটি ওয়াজ মাহফিলে অতিথি করা হয় শওকতকে। সেখানে শওকতের দেয়া বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের জেরে তাকে মানবিক পুলিশ ইউনিট থেকে বদলি করা হয় বন্দর জোনে। পরে তাকে পদায়ন করা হয় কর্ণফুলী থানায়। এর মধ্য দিয়ে মানবিক ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

সিএমপির বন্দর জোনের উপ-কমিশনার শাকিলা সোলতানা সারাবাংলাকে জানান, ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭১ দিন কনস্টেবল শওকত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় তাকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর ১৬ এপ্রিল তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কনস্টেবল শওকত বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন। এতে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা থাকায় এবং বেওয়ারিশ মানুষ নিয়ে মানবিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, সিএমপির বন্দর জোনে ৭১ দিন অনুপস্থিত কনস্টেবল শওকতকে চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলি করা হয়েছিল। ২০২২ সালের ১৩ মার্চ তিনি রেঞ্জে যোগদান করেন। তার পদায়ন হয় কুমিল্লা জেলা পুলিশে। কিন্তু ২০২২ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত ৩৫৩ দিন পর্যন্ত অনুপস্থিত ছিলেন।

তিনবার নোটিশ দেওয়ার পর ১ মার্চ বিকেলে তিনি কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের রিজার্ভ অফিসে হাজির হন এবং একটি লিখিত আবেদন দেন। এতে তিনি অসুস্থ বলে উল্লেখ করলেও এ সংক্রান্ত কোনো চিকিৎসা সনদ জমা দেননি। বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্য তার কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়। তবে এর মধ্যেই তিনি চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত হলেন।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান সারাবাংলাকে বলেন, ‘কনস্টেবল শওকতের বিনা নোর্টিশে তিনি একবছর কাজে যোগদান করেননি। একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তার বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।’

মোট ৪২৪ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে শওকত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিএমপিতে যে ৭১ দিন আমি অনুপস্থিত ছিলাম, সত্যিই আমি অসুস্থ ছিলাম। কুমিল্লায় আমি ইচ্ছা করেই যাইনি। আমাকে যেভাবে মানবিক পুলিশ ইউনিট থেকে সরানো হয়েছে, এটা আমার জন্য অপমানজনক ছিল। আমাকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেয়া হয়েছে। এতে আমার মানবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। এজন্য আমি অভিমানেই মূলত দূরে সরে আসি।’

‘আমি নিজেই ইস্তফা দিয়েছিলাম। কিন্তু উনারা বিতর্কিত হবার ভয়ে আমার ইস্তফাপত্র গ্রহণ না করে বরখাস্ত আদেশ জারি করেছেন। আমার সঙ্গে হিংসাত্মক আচরণ করা হয়েছে। যাক, এ নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। ডিপার্টমেন্ট আমাকে অনেককিছু দিয়েছে। আমিও ডিপার্টমেন্টকে অনেককিছু দিয়েছি। এখন আমি শান্তিতে মানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চাই।’

ওয়াজ মাহফিলে ‘বিতর্কিত’ বক্তব্যের বিষয়ে শওকত বলেন, ‘আমাকে যদি লোকজন দাওয়াত দিয়ে ওয়াজ মাহফিলে নিয়ে যায়, আমি কী যাব না ? আমি ডবলমুরিংয়ে যে ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য রেখেছিলাম, সেখানে আমার আগে ওসি মহসীন স্যারও বক্তব্য রেখেছিলেন। আমি কয়েকটা কথা বলেছিলাম। আবেগের বশে আমার বলা কয়েকটা কথা নিয়ে অনেকে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। কিন্তু আমি অযৌক্তিক কিছু বলিনি।’

লোকজনকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফেসবুকের লাইভে ও ইউটেউবে প্রচারিত ভিডিওতে শওকত হোসেন প্রবাসীদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার কথা বলে থাকেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মানবিক কর্মকাণ্ড কারও কাছ থেকে কখনও এক টাকা চেয়েছি, এটা কেউ বলতে পারবে না। এই অভিযোগ কেউ করলে আমি তার নামে মামলা করব। আমরা যে বেওয়ারিশ সেবা ফাউন্ডেশন করেছি, সেখানে ২০-২৫ জনের একটা উপদেষ্টা কমিটি আছে। আমেরিকা প্রবাসী আমার কয়েকজন আত্মীয়স্বজন এবং উপদেষ্টাদের কাছ থেকে মূলত আমি সেবার জন্য টাকা নিয়েছি।’

শওকত জানালেন, তার প্রতিষ্ঠা করা বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনে পাঁচজন বেতনভুক্ত কর্মচারী আছেন। এছাড়া আরও ৫-৭ জন তাকে নিয়মিত কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.