ডিম পাড়তে এসে মৃত্যুফাঁদে মা কাছিম, নীরবে নিভছে মহেশখালীর উপকূল

নীরব উপকূলে প্রকৃতির হাহাকার, উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীরা

 

হামিদ হোসাইন,   মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

সমুদ্রের বুক চিরে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জীবন রক্ষার শেষ আশ্রয় হিসেবে উপকূলে উঠে আসে মা কাছিম। ডিম পাড়ার জন্য নির্ভর করে মানুষের নির্দয় হাত থেকে এখনো অক্ষত থাকা বালুকাবেলায়।

 

কিন্তু কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা সৈকতে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ বিষাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ডিম পাড়তে এসে একের পর এক মা কাছিমের মৃত্যু যেন উপকূলজুড়ে নীরব এক আর্তনাদ।

 

গত এক সপ্তাহ ধরে ধলঘাটার হাঁসের চর সমুদ্রসৈকতে সারি সারি মৃত মা কাছিম পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও কোথাও বালুর ওপর পড়ে আছে বিশাল আকৃতির কাছিমের নিথর দেহ। অথচ এত দিন পেরিয়ে গেলেও বন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব মৃত কাছিম অপসারণ কিংবা মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

 

 

স্থানীয় শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শী হুমায়ুন কবির বলেন, তিনি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি মা কাছিম মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন এবং ছবি তুলেছেন। তাঁর আশঙ্কা, সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান দূষণই এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের চলমান নির্মাণকাজের ফলে সাগরে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি কাছিমের প্রজনন ও ডিম পাড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝাউবাগান ও প্যারাবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে কাছিমের নিরাপদ আশ্রয় ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের।

 

 

শুধু ধলঘাটা নয়, মাতারবাড়ি সাইরার ডেইল এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন সৈকতেও একাধিক বড় আকৃতির মৃত কাছিম পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর থেকে সাগরের পানির রং ও গুণগত মান বদলে গেছে। মাছের পরিমাণ কমেছে, বদলে গেছে সাগরের স্বাভাবিক ছন্দ। তাঁদের মতে, এই দূষণেরই নির্মম শিকার হচ্ছে ডিম পাড়তে আসা মা কাছিমগুলো।

মহেশখালী পরিবেশ আন্দোলনের নেতা মৌলানা মহসিন বলেন,
“মা কাছিমের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণ হারানো নয়, এটি পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। কেন এই মৃত্যু ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি সৈকতকে কাছিমের ডিম পাড়ার জন্য সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা না করলে ভবিষ্যতে এ প্রজাতিকে আর দেখা নাও যেতে পারে।”

 

 

এ বিষয়ে মাতারবাড়ি বন বিট কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, তিনি এখনো বিষয়টি অবগত নন। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

 

এ বিষয়ে মহেশখালীর বন বিভাগের রেঞ্জার আয়ূব আলী বলেন, মা কাছিমের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সাগরে মাছ ধরার সময় জেলেদের ফেলা জালের সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কাছিমের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এর বাইরে আপাতত নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

 

ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি এলাকার চর ও সৈকত নিয়মিত তদারকি করা হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই এলাকায় বন বিভাগের বিট অফিস রয়েছে এবং সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকির কাজ করে থাকেন।

রেঞ্জার আয়ূব আলী আরও জানান, মা কাছিমের মৃত্যুর ঘটনাটি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

 

বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। গবেষণা ছাড়া মা কাছিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি সৈকতে মা কাছিমের মৃত্যুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরে আনা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

পরিবেশবিদদের মতে, মা কাছিমের এই মৃত্যু প্রকৃতির প্রতি মানুষের অবহেলারই প্রতিচ্ছবি। আজ যদি সমুদ্র ও উপকূল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায়ই শুধু কাছিমের অস্তিত্ব খুঁজে পাবে—বাস্তবে নয়।

 

 

সৈ/আ/উ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.