চট্টগ্রাম বন বিভাগ : একজন বনপ্রহরীকে গড়ে পাহারা দিতে হয় ১ হাজার ৪০০ একর বনভূমি

উত্তর দক্ষিণে বনভূমি রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২১ হাজার-

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূল বন বিভাগের আওতায় মোট বনভূমি রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২১ হাজার একর।

বন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন ফরেস্ট গার্ড বা বনপ্রহরী। তবে বিশাল এ বনভূমি পাহারায় রয়েছেন মাত্র ৩২০ জন বনপ্রহরী। অর্থাৎ একজন বনপ্রহরীকে গড়ে পাহারা দিতে হয় ১ হাজার ৪০০ একর বনভূমি। সীমিতসংখ্যক লোকবল দিয়ে নিয়মিতভাবে বন পাহারা দিতে পারছেন না তারা। এছাড়া তাদের হাতে বন রক্ষায় পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় বনভূমির নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঠ পাচারে জড়িতরা অনেক সময় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত থাকে। তাছাড়া গহিন বনে রাতে পাচারকারীদের প্রতিরোধ করার মতো সামর্থ্য প্রহরীদের না থাকায় রক্ষা করা যাচ্ছে না মূল্যবান গাছ। দখল হয়ে যাচ্ছে বনভূমি।

বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৮ সালের ২০ ধারা অনুযায়ী চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূল বন বিভাগের সংরক্ষিত বনের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৯ একর। এছাড়া ৪ ও ৬ ধারার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৪ একর সংরক্ষিত বনের জন্য প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্য সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে বন বিভাগের জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ২১ হাজার একর।

বনপ্রহরীরা বলছেন, দীর্ঘদিন এ পদে নিয়োগ নেই। তাছাড়া পদোন্নতি না থাকায় ফরেস্ট গার্ড পদে যারা চাকরি করছেন তারাও কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছেন। অনেকের চাকরির বয়সও শেষ পর্যায়ে। আবার অনেকে অসুস্থ থাকায় গহিন এলাকায় ডিউটি করতে পারছেন না। গত কয়েক বছরে পাচারকারী ও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকারের পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমির অর্ধেকই দুর্গম। গহিন বন থেকে দল বেঁধে গাছ কেটে নিয়ে গেলে দুই-তিনজনের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। দুর্বৃত্তদের হাতে ভারী অস্ত্রও থাকে। এ কারণে রাতেই বনের কাঠ পাচার হচ্ছে বেশি। ২০১৭ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঝুঁকিভাতা সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দেয়া হলেও সবাইকে এর আওতায় আনেনি বন বিভাগ।

চট্টগ্রাম ফরেস্ট গার্ড কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো: জসিম ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘চট্টগ্রামে পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে। চট্টগ্রামের বড় বড় রেঞ্জ ও বন বিটে গড়ে চার-পাঁচজন পাহারা দেন। এত বড় বনভূমি রক্ষা সীমিত ফরেস্ট গার্ড দিয়ে সম্ভব নয়। তাছাড়া বনের নিরাপত্তায় লজিস্টিক সাপোর্টেরও সংকট রয়েছে। এসব কারণে বনের কাঠ পাচার কিংবা বনভূমি রক্ষা করা দুসাধ্য হয়ে পড়ছে। লোকবল বাড়ানো এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করে প্রহরীদের আধুনিকায়ন না করলে বন রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

বন বিভাগের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বন বিভাগ রয়েছে ৪১টি। এ বিভাগে ২৫৫টি বিট ও ৪৬০টি রেঞ্জ রয়েছে। বন বিভাগের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন), ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা (সুন্দরবন) ও বাগেরহাট। রোহিঙ্গাদের বসতির কারণে গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি বনভূমি ধ্বংস হয়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে।

এদিকে বাংলাদেশ ফরেস্ট গার্ড কল্যাণ সমিতির এক কেন্দ্রীয় নেতা   বলেন, ‘বাংলাদেশে ২ হাজার ৪৫১টি ফরেস্ট গার্ড পোস্টের মধ্যে কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। এর মধ্যে অনেকেই চাকরির শেষ প্রান্তে রয়েছেন। মূলত বনের এলাকা অনুযায়ী জনবল খুবই কম। আমাদের প্রতিটি বিটে গড়ে তিন-চারজন দায়িত্ব পালন করেন। বন পাহারা দেয়ার পাশাপাশি অস্ত্রও পাহারা দিতে হয়। অনেকে অস্ত্র পাহারা দেয়ার ভয়ে সেটাও নিতে চান না। যারা বনের জায়গা দখল করে কিংবা কাঠ পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের হাতে অনেক গার্ড বা ফরেস্টারের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ফেনীতে একজনের হাত কেটে ফেলেছিল দুর্বৃত্তরা। নানা সংকটের মধ্যে প্রহরীদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বনভূমি রক্ষা করতে হলে বন বিভাগকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। লোকবল নিয়োগ করা ছাড়া বিভিন্ন ঝুঁকি ভাতার আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনে বাঘে আক্রমণ করতে পারে এজন্য ঝুঁকি ভাতা পাচ্ছেন দায়িত্বরত ফরেস্ট গার্ডরা। বাংলাদেশে অন্য বনে কোনো ঝুঁকি নেই—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বন হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। এটা রক্ষা করতে হবে। সেজন্য বন বিভাগের নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে কাজ করতে হবে।’

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৪সালের ৩১ মার্চ রাতে পাহাড়ের মাটি কেটে পাচারের সময় বাধা দেয়ায় কক্সবাজারের উখিয়ায় বন বিট কর্মকর্তা সাজ্জাদুজ্জামান সজলকে ডাম্পার চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। একই জেলায় ২০২০ সালের ৬ আগস্ট বন বিভাগের ভূমি উদ্ধারে দুর্বৃত্তদের হামলায় মারা যান মহেশখালী রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা ইউসুফ উদ্দিন। ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সংরক্ষিত বনভূমির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শেষে ফেরার সময় হামলায় আহত হন বাঁশখালী ইকোপার্কের জুনিয়র ওয়াইল্ড লাইফ অফিসার বিসু কুমার দাস ও অফিস সহকারী মোহাম্মদ আশিক। এছাড়া বিভিন্ন সময় বনপ্রহরীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

চট্টগ্রাম বন বিভাগে কাজ করা একাধিক ফরেস্ট গার্ড চট্টগ্রাম সংবাদকে জানিয়েছেন, তাদের বিভিন্ন সময় দু:খ দূর্দশায় সমিতির সভাপতি মো: জসিম উদদীন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল ছাড়া তেমন কেউ এগিয়ে আসেননা।তারা আরো বলেন, সমিতির ফরেষ্ট গার্ডদের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য সভাপতি মো: জসিম ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল যথেষ্ট কাজ করেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.