ডেস্ক রিপোর্ট
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরেই দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখা হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসিত আছেন। দেশে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তিনি মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে রয়টার্সকে তিনি এ কথা বললেন।
দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ ছেড়ে পালানো হাসিনা বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসতে চান। আদালতে আত্মসমর্পণ করে তারা দেখতে চান, তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত গড়ানো প্রায় ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সি হাসিনা বলেন, ‘দেশে ফেরার পর ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবু আমাকে যেতেই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর চরম দমন-পীড়ন চলছে। যদি মৃত্যুও আসে, আমি চাই সেটা আমার নিজের মাটিতেই হোক—যে মাটিতে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন, যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’
টানা কয়েক মেয়াদ মিলিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০২৪ সালের নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন হাসিনা। ছাত্র-জনতার সেই অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানোর নির্দেশ দেওয়ার দায়ে গত বছরের নভেম্বরে দেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। নির্বাসনে থাকা হাসিনা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে যখন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজ করছে, তখন হাসিনার প্রত্যাবর্তনে রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দেওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে তাকে ফিরিয়ে দিলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তলানিতে ঠেকা সম্পর্কের কিছুটা উন্নতিও হতে পারে। কারণ নয়াদিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়।
হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বারবার ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
নির্বাসিত জীবনে এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের জবাব দিলেও কখনো সরাসরি কোনো সাক্ষাৎকার দেননি হাসিনা। তিনি বলেন, কবে বা কীভাবে দেশে ফিরবেন—সে বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেননি।
এই প্রথম দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিলেন হাসিনা। পাশাপাশি নিজের ও নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথাও এই প্রথম প্রকাশ্যে আনলেন তিনি।
হাসিনার সঙ্গীদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত। তবে আওয়ামী লীগের অন্য কোনো নেতার সঙ্গে রয়টার্স যোগাযোগ করতে পারেনি। এমনকি তারা বর্তমানে কোথায় আত্মগোপন করে আছেন, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ‘আমাকে দেশে ফেরাতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা ভারতকে একের পর এক চিঠি দিচ্ছে। আমি নিজেই যাব।’
হাসিনার এই মন্তব্যের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গত এপ্রিলেই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ‘গঠনমূলকভাবে কাজ করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে’ আগ্রহী বলেও জানিয়েছিল।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু দীর্ঘ শাসনকালে বিরোধী ও ভিন্নমত এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট ধ্বংস করেছে তার সরকার। তিনি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানে তার পতন ঘটে, তাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ।
দিল্লির গোপন আশ্রয় থেকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন আপনারাও সবাই চলে আসুন। সবাই একসঙ্গে আমরা আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।’
তবে কবে নাগাদ তিনি দেশে ফিরবেন, কিংবা ঠিক কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—সেই সুনির্দিষ্ট তারিখ বা তথ্য জানাতে রাজি হননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি বিচারে বিশ্বাস করি। আমার ধারণা, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনের—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’
দেশে ফেরার এই পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না—জানতে চাইলে হাসিনা বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার আর ন্যায়বিচার—এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’
জেলে যাওয়ার ভয় তার নেই দাবি করে তিনি বলেন, এর আগেও কয়েকবার তিনি গ্রেপ্তার করা হয়েছেন।
১৯৭৫ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন কাটিয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার তিনি আটক হয়েছিলেন। এরপর ২০০৭ সালে তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠায়। পরে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন তিনি।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বিক্ষুব্ধ জনতা যখন তার বাসভবনের দিকে আসছিল, তখন প্রাণনাশের হুমকি থাকার কারণেই দেশ ছেড়েছিলেন বলে হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘একটা সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুলত্রুটি হতেই পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটা সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার একমাত্র জনগণের। আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিলাম।’
আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলে জানান হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন তারা নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে তার ফয়সালা জনগণকেই করতে দেওয়া হোক।’