পূর্বকোণ ডেস্ক
বেদনার কোনো নির্দিষ্ট রঙ নেই। তবু যুগ যুগ ধরে মানুষ বিষাদের রঙ হিসেবে নীলকেই কল্পনা করে এসেছে। হয়তো সে কারণেই বাদামি রঙের একটি সাধারণ কাগজের খামও কখনো কখনো গভীর বেদনার প্রতীক হয়ে ওঠে।
খামটির গায়ে নীল কালিতে লেখা কয়েকটি শব্দ। নিচে একটি নাম-মুনতাসীর। কিন্তু খামটি কখনো পৌঁছাবে না তার প্রকৃত প্রাপকের হাতে| কারণ, যে নামটি সেখানে লেখা, সেই দেড় বছরের শিশুটি আর পৃথিবীতে নেই।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা কেড়ে নিয়েছে বাঁশখালীর ছোট্ট মোহাম্মদ মুনতাসীরের জীবন। অথচ তার মৃত্যুর পরও পরিবারের হাতে পৌঁছানো আর্থিক সহায়তার খামের ওপর লেখা হয়েছে তারই নাম। কারণ, সহায়তাটি ছিল তাকে ঘিরেই-তার অসমাপ্ত জীবনকে ঘিরেই।
মাত্র ১৮ মাস বয়স। ঠিকমতো কথা বলাও শেখেনি, টলমল পায়ে হাঁটাও ছিল নতুন। রাজমিস্ত্রী মোহাম্মদ মহিউদ্দীনের একমাত্র ছেলে, চার ভাইয়ের পরিবারের একমাত্র উত্তরসূরী। বাবা-মায়ের কাছে সে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, দুই বোনের বড় আদরের ছোট ভাই। জন্মের পর থেকেই অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই ছিল মুনতাসীরের। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বাবার সামান্য আয়ের বড় অংশ চলে যেতো ছেলের চিকিৎসায়। ধার-দেনা করে, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে ছেলেকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছেন বাবা। অবশেষে যখন শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলো, হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরল মুনতাসীর। পরিবার ভেবেছিল, সবচেয়ে কঠিন সময়টি হয়তো পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতি তখন যেন অন্য এক পরিণতির গল্প লিখছিল।
টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ডুবে যায়
বাঁশখালীর বাগমারায় চাম্বলের বাপের বাড়িতে থাকা মহিউদ্দীনের বসতঘরও। সবার অজান্তে ঘর থেকে বেরিয়ে জমে থাকা পানিতে ডুবে যায় মুনতাসীর। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখনও বুকের ভেতর প্রাণের স্পন্দন ছিল। কিন্তু শুরু হয় আরেক লড়াই। একটি অটোরিকশা পাওয়া গেলেও চালক যেতে রাজি হননি। বাবা-মায়ের কান্না, স্বজনদের শত অনুরোধ-কোনো কিছুই গলাতে পারেনি তার মন। পরে কোমরসমান পানি পেরিয়ে আরেকটি গাড়িতে করে শিশুটিকে নেওয়া হয় বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। পরে গুনাগরির আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, আর কিছু করার নেই। অসংখ্য প্রার্থনা, অসহায় ছুটে চলা আর স্বজনদের অন্তহীন লড়াইকে পেছনে ফেলে চিরবিদায় নেয় ছোট্ট মুনতাসীর।
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি সংগ্রাম। পুরো কবরস্থান তখন পানিতে থইথই। অনেক কষ্টে পানি সেচে সামান্য উঁচু জায়গা তৈরি করে সেখানে কোনোমতে দাফন করা হয় শিশুটিকে।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে যেন জীবনের প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছেন বাবা মোহাম্মদ মহিউদ্দীন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি ফোনে বললেন, ‘জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই আমার ছেলে অসুস্থ ছিল। নিউমোনিয়ায় অনেক কষ্ট পেয়েছে। না খেয়ে, ধার-দেনা করে চিকিৎসা করিয়েছি। আল্লাহর রহমতে একটু সুস্থও হয়েছিল। ভাবিনি এভাবে হারিয়ে যাবে। আমরা যখন ওকে উদ্ধার করি, তখনও প্রাণ ছিল। কিন্তু সময়মতো হাসপাতালে নিতে পারিনি। আমার চোখের সামনেই ছেলেটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এই কষ্ট কীভাবে ভুলব?’
মহিউদ্দীনের চাচাতো ভাই চাম্বল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রেজাউল করিমও শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার সেই মরিয়া চেষ্টার সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘মহিউদ্দীন খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। কিন্তু ছেলের জন্য কখনো কার্পণ্য করেনি। আমরা উদ্ধার করার পর চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোথাও প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও সময়মতো পাওয়া যায়নি। মুনতাসীরের মৃত্যু আমাদের পুরো এলাকাকে কাঁদিয়েছে।’
মুনতাসীরের মৃত্যুর খবর পৌঁছায় বাঁশখালী স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যদের কাছেও। গত বুধবার সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিবারটির হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। সেই সহায়তার টাকাগুলো ছিল একটি সাধারণ বাদামি কাগজের খামের ভেতর। খামটি যখন বাবা মোহাম্মদ মহিউদ্দীনের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন। তাকিয়ে ছিলেন খামের গায়ে নীল কালিতে লেখা ছেলের নামটির দিকে। মনে হচ্ছিল, তিনি খামটি দেখছেন না—খুঁজছেন বুকের ধনকে।
এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রায়হান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য খুব সীমিত। তবু চেয়েছি পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে। তারা শুধু সন্তানই হারায়নি, বন্যায় ঘরও হারিয়েছে। সমাজের সবারই তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’
খামটির রঙ ছিল বাদামি। কিন্তু তার গায়ে নীল কালিতে লেখা ছিল এমন এক নাম, যার আর কোনো ঠিকানা নেই। তাই সেই বাদামি খামটি আর কেবল একটি খাম নয়, সেটি হয়ে উঠেছে অতল, অনন্ত, অসীম বেদনার ‘নীল প্রতীক’!