উচ্ছেদ অভিযানে বার বার বলির পাঁঠা হচ্ছে রেঞ্জার, কৌশলে বেঁচে যাচ্ছে নির্দেশদাতা এসিএফ ও ডিএফও
অথচ! অভিযানের সময় নেতৃত্বে ছিলেন এসিএফ রানা দেব,তাহলে শাস্তির আওতায় কেন সে আসছেনা?
ডেস্ক রিপোর্ট
সরকারি বনভূমি জবরদখলমুক্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বন রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা সেই দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো মাঠ কর্মকর্তা যদি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনার দায় একা তাঁর ওপর বর্তায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: সিদ্ধান্তটি যাঁরা নিয়েছেন এবং অভিযান যাঁরা অনুমোদন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের দায় কোথায়?
টাঙ্গাইল বন বিভাগের বহেড়াতলী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (আরও) মো. এমরান আলীকে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) কার্যালয়ে সংযুক্ত করার ঘটনায় এমনই এক গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যে দ্রুত এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখানে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারে, প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কিন্তু তদন্তের আগে কাউকে দায়ী সাব্যস্ত করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি একটি যৌথ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় কেবল একজন মাঠ কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আদেশ যদি ওপর থেকে আসে, দায় কি শুধু নিচের কর্মকর্তার?
বনের জমি পুনরুদ্ধারের মতো একটি বড় উচ্ছেদ অভিযান সাধারণত একজন রেঞ্জ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের অভিযানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, আইনগত প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন—সবকিছুর সমন্বয় থাকে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বহেড়াতলী রেঞ্জের ওই অভিযান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নাজমুল আলমের নির্দেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়েছিল। তাঁদের আরও দাবি, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) রানা দেব সরেজমিনে উপস্থিত থেকে অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
যদি এসব তথ্য তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—অভিযানের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন যদি ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে হয়ে থাকে এবং ঘটনাস্থলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তী জটিলতার দায় নির্ধারণে শুধু রেঞ্জ কর্মকর্তাকে কেন সামনে আনা হবে?
দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পদমর্যাদা নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা, নির্দেশের প্রকৃতি এবং প্রত্যেক কর্মকর্তার কার্যকর ভূমিকা বিবেচনা করা জরুরি।
মাঠকর্মীদের জন্য তাহলে বার্তাটি কী?
বন বিভাগের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব পালন করেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ও কর্মচারীরা। তাঁরা প্রত্যন্ত এলাকায় যান, জবরদখল উচ্ছেদ করেন, বন অপরাধীদের মোকাবিলা করেন, কখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করেন। সরকারি বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব তাঁদের ওপরই সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু তাঁদের মধ্যে যদি এমন ধারণা জন্ম নেয় যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিজেদের রক্ষা করতে অধীনস্থ কর্মকর্তাকে একা সামনে ঠেলে দিতে পারেন, তাহলে তার প্রভাব শুধু একজন কর্মকর্তার ওপর পড়ে না; পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পড়ে।
আজ একজন রেঞ্জ কর্মকর্তা যদি ভাবেন—ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন করেও শেষ পর্যন্ত সব দায় তাঁর একার হতে পারে, তাহলে আগামীকাল তিনি কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে জবরদখল উচ্ছেদে যাবেন?
এই প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও তদন্তের বিষয়
এ ঘটনায় রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের পর বন বিভাগ দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ সরকারি কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন আইন, বিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।
তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য: অভিযোগ মানেই সত্য নয়। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
একজন মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তির কোনো বক্তব্যের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটিও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। কী ঘটেছিল, কার নির্দেশে অভিযান হয়েছিল, ঘটনাস্থলে কারা ছিলেন, কী ধরনের প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
দায় নির্ধারণ হোক, বলির পাঁঠা নয়
এখানে বন বিভাগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জবাবদিহি এবং বলির পাঁঠা বানানো এক বিষয় নয়।
কোনো অভিযানে অনিয়ম হয়ে থাকলে অবশ্যই দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। নির্দেশদাতা, অনুমোদনকারী, তদারককারী, ঘটনাস্থলে নেতৃত্বদানকারী এবং বাস্তবায়নকারী—প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
শুধু মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়ে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরের দায় আড়াল করা হয়, তাহলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না।
বরং এতে প্রশাসনে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হবে—উপরে সিদ্ধান্ত, নিচে দায়।
এমন সংস্কৃতি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যই সুস্থ নয়।
দরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত
বহেড়াতলী রেঞ্জের ঘটনাটি তাই শুধু একজন রেঞ্জ কর্মকর্তার প্রশাসনিক সংযুক্তির বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি বড় প্রশ্ন।
এ ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে অন্তত পাঁচটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—
১. উচ্ছেদ অভিযানের মূল সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন?
২. লিখিত বা মৌখিক নির্দেশনা কী ছিল?
৩. অভিযানে কোন কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অনুমোদন, তদারকি বা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?
৪. অভিযানের সময় কোনো আইন বা প্রশাসনিক নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছিল কি না?
৫. পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কাজ করেছে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বেরিয়ে এলে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বন রক্ষায় মাঠকর্মীদের মনোবলই মূল শক্তি
বাংলাদেশের বন রক্ষা করতে হলে শুধু নীতিমালা, প্রকল্প কিংবা সভা দিয়ে হবে না। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃঢ়তা ও মনোবল।
সরকারি বনভূমি দখলমুক্ত করতে গিয়ে একজন কর্মকর্তা যদি জানেন যে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ করলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে তাঁকেই একা দায় নিতে হতে পারে, তাহলে বন রক্ষার লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে।
তাই বন বিভাগের কর্তৃপক্ষের উচিত কাউকে রক্ষা করা নয়, কাউকে বলির পাঁঠা বানানোও নয়—বরং প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা।
যদি রেঞ্জ কর্মকর্তা এমরান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, যথাযথ তদন্ত হোক। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযানের নির্দেশদাতা ডিএফও এবং সরেজমিনে নেতৃত্বদানকারী এসিএফের ভূমিকাও তদন্তে আসুক। তাঁরা নির্দোষ হলে তদন্তেই তা পরিষ্কার হবে।
কারণ ন্যায়বিচারের অর্থ কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; প্রকৃত দায়ীকে দায়ী করা এবং নির্দোষকে দায়মুক্ত করা।
বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়—এটি রাষ্ট্রের বনসম্পদ রক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজন।
উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হলে দায় যেমন যৌথভাবে খতিয়ে দেখতে হবে, তেমনি অভিযান সফল হলেও তার কৃতিত্বও শুধু একজনের নয়। প্রশাসনে এই ন্যায্যতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।