বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সঠিক চিকিৎসার অভাবে ও ভুল চিকিৎসা নেওয়ার কারণে ডেঙ্গু জ্বরজনিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে এক গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নিহত গৃহবধূ রিটা সোলতানা (২০) কে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহত গৃহবধূ বাবার বাড়ি সরল ইউনিয়নের মিনজীরতলা এলাকায়। শাশুর বাড়ি বৈলছড়ি ইউনিয়নের অভ্যারখীল এলাকায়। তাঁর কোলে ৬ মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান রয়েছে, যা বর্তমানে মাতৃহীন হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই গৃহবধূ তীব্র জ্বর ও শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তবে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে না গিয়ে তিনি সরল ইউনিয়নের খালাইচ্ছার দোকান এলাকার পল্লী চিকিৎসক (কোয়াক) ডাঃ জমির উদ্দিনের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু ভুল চিকিৎসা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকে জলদী আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত এই ভুয়া হাতুড়ে ডাক্তার জমিরের বিগত ৩ বছর পূর্বে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা ও রোগীর জীবন বিপন্ন করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে এক প্রসূতি নারীর স্তনে (ব্রেস্ট) অনধিকার চর্চা করে অপচিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে রোগীকে চরম জীবনঝুঁকিতে ফেলে দেন তিনি। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ততকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মাহমুদুল হাসান অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসক জমিরকে জরিমানা ও জেলহাজতে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে এসে আবারও তিনি একই ধরনের মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
এই দিকে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সচেতন মহল থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু জ্বর এবং এর আনুষঙ্গিক জটিলতা অত্যন্ত টেকনিক্যাল ও সংবেদনশীল বিষয়, যার সুচিকিৎসা একমাত্র এমবিবিএস এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারাই সম্ভব। জ্বর বা যেকোনো জটিল লক্ষণ দেখা দিলে কোনো অপচিকিৎসকের দ্বারে না গিয়ে সরাসরি বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অনভিজ্ঞ অবস্থায় জটিল কোনো রোগের চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার বা দক্ষতা কোনো পল্লী চিকিৎসকের নেই।
এ বিষয়ে ভুয়া হাতুড়ে ডাক্তারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একজন কনসালটেন্ট এমবিবিএস ডাক্তার বলেন,
বিগত কয়েক বছর পূর্বে এই পল্লী চিকিৎসক এক চর্ম রোগীর পেটের মধ্যে টিনিয়া (দাঁদ) হয়। সে ওই চিকিৎসকের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে গেলে সেই চিকিৎসক তাকে পেটের মধ্যে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে পুরো ইনফেকশন করে ফেলে। পরবর্তীতে উক্ত রোগী আমার চেম্বার এ আসার পর আমি তাকে দ্রুত
চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে রেফার করি।
এ দিকে এই বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুমিনুল হক তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক আইডিতে লিখেন, কলম একটা থাকলেই সব কিছু লেখা যায়না।যে রোগের র ও বুঝেননা সেগুলো নিয়ে বাল পাকনামি করার দরকার নেই।এভাবে অপচিকিৎসাতে অনেক মানুষের ক্ষতি হচ্ছে দিন দিন। আল্লাহ সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুন। প্রেসক্রিপশনের সেইম ব্যক্তি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপকর্ম করে কেমনে পার পেয়ে যাচ্ছেন। তার খুঁটির জোর কোথায় সেটা দেখার বিষয়!
এ ব্যাপারে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী বলেন, বৈলছড়িতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৬ মাসের এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। ডেঙ্গু জ্বর বা এর ফলে সৃষ্ট যেকোনো জটিলতা (যেমন হেপাটাইটিস বা অন্যান্য অঙ্গহানি) অত্যন্ত টেকনিক্যাল ও জীবনঘাতী একটি বিষয়। এ ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসা শুধুমাত্র এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারাই সম্ভব। একজন সাধারণ বা প্রান্তিক পর্যায়ের হাতুড়ে চিকিৎসকের পক্ষে ডেঙ্গুর মতো জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।”
ইতিপূর্বে বিগত ৩ বছর আগে অভিযুক্ত এই চিকিৎসক বিভিন্ন সময় অপচিকিৎসা চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা ভোগ করেছেন। শাস্তি পেয়েও যারা সংশোধন না হয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, ইতিমধ্যে
আমরা বিষয় টা তদন্ত করতেছি। খুব শীগ্রই তার বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”