ক্রীড়া প্রতিবেদক
এশিয়া কাপ ফাইনালে গতকাল পাকিস্তানের প্রথম তিন উইকেট তুলে নেন লংকান পেসার প্রমোদ মদুশান ছবি: আইসিসি
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবার এশিয়া কাপ আসর আয়োজনই করতে পারেনি শ্রীলংকা। কাগজে-কলমে আয়োজক শ্রীলংকা হলেও খেলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও শারজায়। শেষ পর্যন্ত ঘটনাবহুল এ টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতল শ্রীলংকাই।
দুবাইয়ে গতকাল এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারিয়েছে দাসুন শানাকার দল। ভানুকা রাজাপাকসের হাফ সেঞ্চুরিতে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে ১৭০ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় শ্রীলংকা। এরপর প্রমোদ মদুশানের গতি আর হাসারাঙ্গা ডি সিলভার ঘূর্ণির সামনে পাকিস্তান ১৪৭ রানে গুটিয়ে যায়। এটা এশিয়া কাপের ইতিহাসে শ্রীলংকার ষষ্ঠ শিরোপা। সর্বোচ্চ সাতটি শিরোপা জয়ের গৌরব ধরে রেখেছে ভারত। বাকি দুটি শিরোপা গেছে পাকিস্তানে।
এমন একটি দলের মাথায় উঠল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নের মুকুট, যাদের আগামী মাসে টি২০ বিশ্বকাপে খেলতে হবে প্রথম রাউন্ড নামের বাছাই পর্বে! এমনকি, এশিয়া কাপেও প্রথম ম্যাচে তারা হেরেছে আফগানিস্তানের কাছে। এরপর রূপকথা লিখেছে সিংহলিজরা। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান ও সবশেষ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারাল শানাকার তারুণ্যনির্ভর দলটি।
কাল ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়ের শুরুটাও ভয়ংকর হয় শ্রীলংকার। দিলশান মাদুশঙ্কা নতুন বল হাতে নিয়ে প্রথম বলেই ‘নো’ দেন। এরপর টানা চার বলে দেন ‘ওয়াইড’। এর মধ্যে চতুর্থটি আবার বাউন্ডারি লাইন অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ কোনো বল না হওয়ার আগেই বোর্ডে ৯ রান পেয়ে যায় পাকিস্তান। ষষ্ঠ প্রচেষ্টায় ‘বৈধ’ বল করতে পারেন মাদুশঙ্কা। ওই বলটিতে এক রান নেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। যদিও এরপর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান মাদুশঙ্কা। শেষ ৫ বলে মাত্র দুই রান দেন। মাদুশঙ্কার বিভীষিকাময় শুরুর পরও প্রথম ওভার থেকে পাকিস্তান পায় ১২ রান।
মাদুশঙ্কার মতোই দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় শ্রীলংকা। চতুর্থ ওভারে পরপর দুই বলে বাবর আজম ও ফখর জামানকে আউট করে শ্রীলংকাকে দুর্দান্ত সফলতা এনে দেন প্রমোদ মদুশান। পাকিস্তানের সংগ্রহ তখন ২২/২। এরপর তৃতীয় উইকেটে ইফতিখার আহমেদকে নিয়ে ৭১ রানের জুটি গড়ে স্থিতি আনেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। ৩১ বলে ৩২ রান করে ওই মদুশানের শিকার হন ইফতিখার।
শেষ ৩০ বলে ৭০ রানের প্রয়োজন পড়ে পাকিস্তানের। তখনই আবার আঘাত হানে শ্রীলংকা। দলীয় ১০২ রানের সময় মোহাম্মদ নওয়াজকে শিকারে পরিণত করেন চামিকা করুনারত্নে। শেষ চার ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৬১ রান। তবে ১৭তম ওভারের প্রথম বলেই মোহাম্মদ রিজওয়ানকে (৪৯ বলে ৫৫) আউট করে পাকিস্তানের সম্ভাবনা শেষ করে দেন হাসারাঙ্গা ডি সিলভা (১১০/৫)। এরপর আর ৩৭ রানের মধ্যে বাকি ৫টি উইকেট হারিয়েছে পাকিস্তান। মদুশান ৩৪ রানে চারটি, হাসারাঙ্গা ২৭ রানে তিনটি ও করুনারত্নে ৩৩ রানে দুটি উইকেট নেন।
এর আগে টস জিতে ফিল্ডিং বেছে নেন পাকিস্তান দলনায়ক। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলতি এশিয়া কাপে আগে ফিল্ডিং করা দলগুলোই জিতেছে। বাবরও তাই ফিল্ডিং নেন। প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই কুশল মেন্ডিসকে বোল্ড করেন নাসিম শাহ। চতুর্থ ওভারে সুপার ফোর রাউন্ডে পাকিস্তানের বিপক্ষে লংকানদের জয়ের নায়ক পাথুম নিশাঙ্কাকে সাজঘরে ফেরান হারিস রউফ। মিডঅফে তার ক্যাচ নেন বাবর। এরপর ইফতিখার আহমেদ, রউফ আর শাদাব খানের দুর্দান্ত বোলিংয়ের মুখে ৫৮ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে শ্রীলংকা।
ততক্ষণে ৯ ওভার শেষের পথে। শ্রীলংকার সমর্থকরাও হয়তো ভাবেননি, এর পরও তাদের দল বোর্ডে ১৭০ রান তুলবে। কিন্তু অনবদ্য এক ইনিংস খেলে সেটাই করে দেখালেন রাজাপাকসে। ৪৫ বলে ৬টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ৭১ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। এ পথে ষষ্ঠ উইকেটে হাসারাঙ্গা ডি সিলভাকে (২১ বলে ৩৬) নিয়ে ৩৬ বলে ৫৮ ও সপ্তম উইকেটে চামিকা করুনারত্নেকে (১৪ বলে ১৪*) নিয়ে ৩১ বলে ৫৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন রাজাপাকসে।
১৮তম ওভারের চতুর্থ বলে ব্যক্তিগত ৪৬ রানে জীবন পান রাজাপাকসে। হারিস রউফের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। যদিও বলটি আকাশে এতই ওপরে উঠে যায় যে খেই হারান লং অফে দাঁড়ানো শাদাব খান। বলটি তিনি তালুবন্দি করতে পারেননি। এ সুযোগে তিন রান তুলে নেন রাজাপাকসে। জীবন পেয়ে ৩৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন এবং আরো ১১টি বল খেলে মূল্যবান ২২ রান এনে দিয়েছেন শ্রীলংকাকে। শেষ পর্যন্ত রাজাপাকসের ব্যাটে গড়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই শ্রীলংকাকে জিতিয়েছেন মাদুশঙ্কা ও হাসারাঙ্গারা।
হার শেষে পাকিস্তান তারকা রিজওয়ান বলেন, আমি মনে করি, কোনো দল যদি টস নিয়ে চিন্তা করে, তবে তারা চ্যাম্পিয়ন নয়। আজ শ্রীলংকা টস নিয়ে ভাবেনি। তারা আমাদের ভুলের সুযোগ নিয়ে আঘাত করেছে। যোগ্য দল হিসেবে শ্রীলংকাই চ্যাম্পিয়ন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলংকা: ২০ ওভারে ১৭০/৬ (রাজাপাকসে ৭১*, হাসারাঙ্গা ৩৬; হারিস রউফ ৩/২৯)। পাকিস্তান: ২০ ওভারে ১৪৭/১০ (রিজওয়ান ৫৫, ইফতিখার ৩২; মদুশান ৪/৩৪, হাসারাঙ্গা ৩/২৭, করুনারত্নে ২/৩৩)। ফল: শ্রীলংকা ২৩ রানে জয়ী।