বাঁশখালীতে অবৈধ ইটভাটায় দিন দুপুরে পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ

নিরব ভূমিকায় প্রশাসন

বাঁশখালী প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ইট ভাটা গুলো অবৈধ ভাবে দিন দুপুরে পোড়াচ্ছে কাঠ। পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া স্বত্বেও সরকারি নিয়ম নীতি না মেনে সম্প্রতি ইট ভাটা গুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোর অভিযোগ করছে স্থানীয় জনগণ। কিন্তু প্রশাসনের কোন নজরদারি নেই। রয়েছে নিরব। যেন দেখে ও না দেখার ভাব। নির্দিষ্ট ভাবে ১২০ ফুট চিমনির মাধ্যমে ইট পোড়ানোর নিয়ম থাকলেও দু’একটা ছাড়া কয়েকটি ইট ভাটা সেই নিয়মও মানছে না। গতবছর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইট ভাটা গুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে পুনরায় এসব ইটভাটা আবারও চালু করা হয়। কিন্তু পরিবেশ নানা ভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়লেও এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ জোরালো কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ১১ টি ইটভাটা রয়েছে। তার মধ্যে পুকুরিয়া ইউনিয়নের চা-বাগান সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে জিকজ্যাগের পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে লম্বা চিমনির মেসার্স চৌধুরী ব্রীক নামের নবনির্মীত ইটভাটা। তা ছাড়া সাধনপুর ইউনিয়নের লটমনি পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ৩ টি ইটভাটা। একইভাবে বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে কৃষি জমিতে গড়ে উঠেছে ৩টি ইটভাটা, চাম্বল-বড়ঘোনা সড়কের পাশেই লোকালয়ে ১টি, শেখেরখীল-ছনুয়া সড়কে ১টি। অন্যদিকে বাঁশখালী সাতকানিয়া সীমান্তের চূড়ামণি এলাকায় ২টি ইটভাটা রয়েছে। বাঁশখালীর বাহারছড়ায় ৩টি ইট ভাটার মধ্যে ১টিতে ১২০ফুট চিমনি থাকলেও অপর গুলোতে পুরাতন আমলের ড্রাম চিমনির মাধ্যমে ইট পোড়ানো হচ্ছে। উপজেলার সরল ইউনিয়নের মিনজিরতলা গ্রামের পশ্চিমে একটি কৃষিজমির মাঠে গত বছর আগে ইটভাটাটি স্থাপন করা হয়। এ ভাটায় প্রতিবছর নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইট তৈরি করা হয়। এখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়। ইটভাটাটিতে আধুনিক পরিবেশবান্ধব জিগজ্যাগ চিমনি ব্যবহার করা হয়নি। সনাতন পদ্ধতির ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পোড়াতে কাঠের প্রয়োজন। অন্যদিকে কাঠ চেরাইয়ের জন্য উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটার আশেপাশে করাতকল স্থাপন করা হয়েছে। জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করায় ইট পোড়ানোর মৌসুমে প্রচুর বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয়। এতে আশপাশের জমিতে ধানের আবাদ ও এলাকার ফলদ গাছপালার উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ফলে আশেপাশের পরিবেশের চরম বিপর্যয় হচ্ছে বলে স্থানীয় ভাবে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছাড়াই এসব ইটভাটা গুলো গড়ে তুলেছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে ৩ কিলোমিটারের দূরতে কৃষি জমি রয়েছে ৩ টি ইটভাটা। রত্নপুরে গত ৪-৫ বছর আগে গড়ে উঠেছে আরো একটি ইটভাটা। এসব ইটভাটা গুলোর লাগোয়া রয়েছে কয়েক গ্রামের হাজার মানুষের বাস। স্থানটি কোনোভাবেই ইটভাটা স্থাপনের জন্য উপযুক্ত নয়। ইট পোড়ানোর ফলে এই এলাকার জনস্বাস্থ্য যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি আশপাশের বনাঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একবার ইট পোড়াতে প্রায় চার হাজার মণ কাঠ পোড়াতে হয়। এসব কাঠ জোগাড় হচ্ছে আশপাশের সংরক্ষিত বন থেকেই। ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে গাছপালা। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়ছে। পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ইটভাটা গুলো গড়ে উঠলেও তা নিয়ে কারও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
এসব অবৈধ ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। একটা সময় এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। পরিবেশদূষণ করে ও জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে যারা এভাবে ইটভাটা গড়ে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ আইন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন আরও কঠোর করা ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্হানীয়রা।

অবৈধ ইটভাটার মালিকরা দাবি করেছেন, তাঁদের পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উেকাচ দিয়ে ইটভাটা চালু রাখতে হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা চালু রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তাঁরা বলেন, শুরুতে তাঁরা ড্রাম চিমনি পদ্ধতির ভাটায় ইট পোড়াতেন। পরে সরকার ১২০ ফুট উঁচু চিমনি দিয়ে ইটভাটা তৈরির নির্দেশনা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশির ভাগ ইটভাটা ১২০ ফুট উঁচু চিমনিতে রূপান্তরিত করা হয়। সর্বশেষ সরকার নতুন এক নির্দেশনায় জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড কিলন, ভারটিক্যাল স্যাফট কিলন, টানেল কিলন পদ্ধতিতে ইটভাটা প্রস্তুতের নির্দেশনা জারি করে। তবে তারা সেই নীতিমালা মানছে না। কারণ, এরই মধ্যে সব ভাটায় ইট পোড়ানো শুরু হয়ে গেছে। আগামী মার্চ পর্যন্ত চলবে ইট পোড়ানো। এরপর মাত্র তিন মাসে কোনো অবস্থায়ই ইটভাটা রূপান্তরিত করা যাবে না। কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোর ফলে দিন দিন বৃক্ষ শূন্য হয়ে পড়ছে পরিবেশ ও বনাঞ্চল। একটি গ্রুপ পাহাড়ি মাটি কেটে ইট ভাটা গুলোতে সরবরাহ করছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। এদিকে পাহাড় থেকে মাটি কেটে ইট ভাটা গুলোতে নিয়ে আসার ফলে দিন দিন বিনষ্ট হচ্ছে পাহাড়ি ভূমি। ইট ভাটা গুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে ইট ভাটার মালিকগণ কয়লার সংকটের কারণে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবী করেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ কয়লার চেয়ে কাঠের দাম কম হওয়ায় ইট ভাটা গুলোতে প্রতিনিয়ত বেপরোয়া ভাবে পোড়াচ্ছে অবৈধ কাঠ

চাম্বল বনবিট কর্মকর্তা শেখ আনিসুজ্জামান বলেন, সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ইটভাটা গুলোতে পাহাড় কাটা ও কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ ভাবে নিষেধ রয়েছে। তবে পরিবেশ বান্ধব নিয়ম অনুসারে ইটভাটা হলে বন বিভাগের কোন আপত্তি নাই। যে সমস্ত ইটভাটা পরিবেশ বান্ধব নিয়ম না মেনে পাহাড়ি মাটি বা কাট ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ইতিমধ্যে কেউ যাতে পাহাড় থেকে মাটি ও কাঠ না কাটে সেই জন্য কঠোর ভাবে নজরদারীতে রাখা হয়েছে।তবে নিয়ম বহির্ভূত কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিগত কয়েকবছর আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলায় অভিযান করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অবরোধের মুখে পড়ে। পরে অনেক দেনদরবার করে সে যাত্রায় আর অভিযান পরিচালনা করা সম্বব হয়না। অভিযান না চালানোর জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের চাপ ও রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকারের নিয়ম বহির্ভূত পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা তৈরিতে কোন বাধা নাই। তবে পাহাড়ি থেকে কাটা মাটি ও কাট পড়ানোর কোন নিয়ম নাই। যদি কেউ এই নিয়ম না মেনে চলে তদন্ত পূর্বক তাদেরকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লক্ষ টাকার জরিমানা করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.