সাত বছর ধরে অকেজো দুই কোটি টাকার স্লুইস গেইট

পটিয়া প্রতিনিধি:

জোয়ার-ভাটায় নদ-নদীর পানির স্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিকাজের সুবিধার জন্য নির্মিত ২ কোটি টকার স্লুইস গেইট নির্মাণের পর থেকেই অকেজো পড়ে আছে । পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় জলবায়ু ট্রাস্টের অর্থায়নে পটিয়া উপজেলার কাশিয়াইশ ইউনিয়নের বাঁকখাইন এলাকায় স্লুইস গেইটটি সাত বছর আগে নির্মাণ করা হয়। নিমার্নের পর থেকেই এ স্লুইস গেইটটি এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসেনি। এভাবেই তদারকির অভাবে নষ্ট হতে বসেছে আরো একটি স্লুইস গেইট। সরকারি সম্পদ যেভাবে নষ্ট হচ্ছে যেন দেখার কেউ নেই। চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান শতকোটি টাকার প্রকল্প থেকেই পরিত্যক্ত হওয়া স্লুইস গেইটটির পাশাপাশি আরেকটি নতুন স্লুইস গেইট নির্মান করা হবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে পটিয়া উপজেলার কৈয়গ্রাম-মালিয়ারা-বাঁকখাইন- ভান্ডারগাঁও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের আওতায় বাঁকখাইন স্লুইস গেইট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ২০১৩ সালের দিকে শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৬ সালের শেষের দিকে। কিন্তু উদ্বোধনের বছরেই স্লুইস গেইটটি দেবে যায়। এসময় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এলাকার মানুষদের বলেছিলেন এটি ভূমিকম্পে দেবে গেছে। বর্তমানে স্লুইস গেইটটির আশপাশে নানা জঞ্জাল সৃষ্টি হয়েছে। কোন রকম বালির বস্তা দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে। স্লুইস গেইটের ডালার মুখ ভাঙা, কাটা এবং গাছগাছালিতে ভরা। দেখলে বোঝা যায় দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে গেইটটি। এলাকাটিতে নির্মিত আরো ৩টি স্লুইস গেইট মেরামতের অভাবে লক্কর ঝক্কর ভাবেই পড়ে আছে। স্থানীয়দের দাবি, পাউবোর তদারকির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে স্লুইস গেইট গুলো। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বানানো হয়েছে সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। নিম্নমানের কাজের কারণে এবং নয়ছয় প্রকল্প গ্রহণের ফলে কয়েকশ একর কৃষিজমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। সে সাথে জোয়ার ভাটায় ক্ষতিগ্রস্হ হচ্ছে রাস্তাঘাট। নদীর পানির লবণাক্ততায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। প্রকল্পের ঠিকাদার মহসিন হায়দার এ প্রসঙ্গে জানান , কয়েক বছর সময় অতিবাহিত হওয়ায় আসলে আমার ঠিক মনে নেই ফাইল দেখে বলতে হবে। তিনি আরো জানান, এ প্রকল্পের কাজটি আমি ঢাকার এক ঠিকাদারের নামে নিয়েছিলাম তখন অনেক ঝামেলা হয়েছিল। সে সময় ঢাকার সেই ঠিকাদারকে মতিঝিলে সন্ত্রাসীরা গুলি করে মেরে পেলেন। ২ কোটি ২০ লাখ টাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কাজে একটি স্লুইস গেইট, আশে পাশে আরেকটি ক্যানেল কাটা আছে সেটি বাইরে করে স্লুইস গেইটের ভিতর দিয়ে খালটি ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর ১ হাজার ফুট বেড়িবাধ নির্মাণের কাজ ছিল এ প্রকল্পে। তিনি সাত বছর আগে নির্মিত স্লুইস গেইটটি দেবে গিয়ে অকেজো হওয়ার ব্যাপারে অবগত নন বলে জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক যুবক বলেন, বাকখাইন স্লুইস গেইটটি স্থাপনের পর থেকেই দেখছি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কৃষিকাজে উপকার তো দূরের কথা, বরং এই গেইটের কারণে এলাকার তিন ফসলি জমির চাষাবাদ করতে পারছেন না। এখন যদি এই গেইট উঠিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে নদী থেকে প্রবাহিত পানি দিয়ে হলেও অন্তত কৃষকেরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারতেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কেউ এদিকে নজর দিচ্ছে না। দক্ষিণ মালিয়ারা গ্রামের কৃষক আহমেদ কবির বলেন, বছরের পর বছর ধরে স্লুইস গেইট ঝোপঝাড়ে পরিত্যক্ত জায়গা হিসেবে পড়ে রয়েছে। গেটের অন্য পাশ দিয়ে নৌপথ তৈরি হয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন করেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এদিকে, মালিয়ারা, মহিরা ও বাকখাইন এলাকার হাজারো একর অনাবাদি জমি পড়ে আছে। বৃষ্টির জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়। যদি স্লুইস গেইটটি সচল থাকতো তাহলে সারা বছরই নদীর পানি ব্যবহার করে প্রান্তিক চাষিরা তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারতেন। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এ প্রকল্পের সুফলের কথা প্রচার করলেও এ অঞ্চলের মানুষ সুফল তো দূরে থাক প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছে। সাধারণ মানুষের জায়গায় বেড়িবাঁধ নির্মাণকালে সড়ক হবে বলা হলেও সড়ক নির্মাণ হয়নি। বরং খানাখন্দে পরিণত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ক্ষতিপূরুণ দেয়া হয়নি। আগামীতেও পটিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এর চলমান প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের আদৌ উপকারে আসবে কিনা সন্দেহ। মালিয়ারা বেড়িবাঁধ এলাকার মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে বের হওয়া মুসল্লী কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, যখন বেড়িবাঁধ ও স্লুইস গেইট নির্মাণ করেছিলেন তখন আমরা অনেক খুশি ছিলাম। অন্তত প্রতি বছর জমিতে তিন বার চাষাবাদ করতে পারব। কিন্তু কাজের পরপরই স্লুইস গেইটটি নষ্ট হয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ছোট এবং অপরিকল্পিত হওয়ায় খালের লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে আমরা এখন কোন চাষাবাদ করতে পারছি না। বর্ষার সময়ে যেমন পানি আসে, তেমনি খরার সময়েও খালের পানি আসে। পানি যে গেইট দিয়ে ধরে রাখবে, তার কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব গেইট থাকলেও কিছু হয় না। আবার না থাকলেও কিছু হয় না। বরং গেইট গুলো জঙ্গলে পরিণত হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বছরের পর বছর। এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ২০১৯ সালে ভিত্তি প্রস্তর স্হাপন হওয়া পটিয়ায় শত কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজও শেষ করতে পারেনি। ২০২৪ সালের দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত প্রায় ৪ বছরেও ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, এ প্রকল্পের জন্য কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বড় অঙ্কের উৎকোচ নিয়েছেন। এই প্রকল্প নয়ছয় করে শেষ করা হয়েছিল। যে কারণে বছর না ঘুরতে স্লুইচ গেইট দেবে গিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। পটিয়া পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী অপু দেব জানান , বাকখাইন অংশে ভুমিকম্পে দেবে গিয়ে স্লুইস গেইটটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আমরা সরেজমিনে দেখে এসেছি। চলমান প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে আরেকটি নতুন স্লুইস গেইট।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.