মনগড়া অপপ্রচারের শিকার বন বিভাগ,আইনী লড়াইয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ফরেস্টার্স অ্যাসোসিয়েশন
ভূয়া পেজগুলোর বিরুদ্ধে ৮ফেব্রুয়ারি সংবাদ ছাপিয়েছে চট্টগ্রাম সংবাদ পত্রিকা -
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে একের পর এক অপপ্রচারের শিকার হচ্ছে বন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে সামাজিকভাবে চরম হেয় হতে হচ্ছে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিবেদিত বনকর্মীদের। দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুকে নামে বেনামে বিভিন্ন আইডি ও পেজ খুলে বন বিভাগের বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অপপ্রচারে অংশ নিয়েছেন গুটিকয়েক অবসরপ্রাপ্ত বন বিভাগের কর্মচারীরাও।
অনুসন্ধান বলছে—ক্রাইম সেক্টর, ক্রাইম ইনভিস্টিগেশন, ইনভিস্টিগেশন নিউজ, সেভ ফরেস্ট, স্বাধীন বাংলাদেশসহ এমন আরো অনেক নামে বেনামে ফেসবুকে পেজ খুলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় কর্মরত একজন বাগানমালী পর্যন্ত কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না অপপ্রচার থেকে।
বন বিভাগে কর্মরতদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপপ্রচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না বন বিভাগে ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের সংগঠনগুলো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন বিভাগে কর্মরত অনেকেই এসব ভুয়া ও মনগড়া সংবাদের বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেও রেহাই পাচ্ছেন না।

অনুসন্ধান আরো বলছে, বন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি আদেশ, বনায়ন, বাগান রক্ষণাবেক্ষণ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। অথচ এসব সরকারি কার্যক্রম ও বদলি আদেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে। বন অধিদপ্তরের অধীন দেশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির সময় হলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে ওঠে এসব চক্র। কাকে কোথায় বদলি করা হবে এমন অনুমান নির্ভর অপপ্রচার চালানো হয় কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই। এতে বিব্রত হচ্ছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা। ভুয়া সংবাদ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না বন সংরক্ষকরাও। দেশের বিভিন্ন সার্কেল বা অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা বন সংরক্ষকদের দাপ্তরিক বিভিন্ন বিষয়সহ ব্যক্তিগত বিষয়ে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য সম্বলিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। ফেসবুকে এসব ভুয়া আইডি ও পেজগুলোর সঠিক ঠিকানা নেই। নেই বার্তা প্রেরণের ঠিকানাসহ মোবাইল ফোন নাম্বার। এতে আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছেন অপপ্রচারের শিকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার হয়ে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল বন বিভাগে কর্মরত রেঞ্জ কর্মকর্তা নূরে আলম হাফিজ টাঙ্গাইল সখিপুর থানায় একটি জিডি (জিডি নং-১৬৭০) করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ক্রাইম সেক্টর নামে একটি পেজে বাংলাদেশ ফরেস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অপপ্রচার থেকে রক্ষা পাননি বন মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও। একই দিনে টাঙ্গাইল সদর থানায় অপপ্রচারের অভিযোগে জিডি করেন (জিডি নং- ২০৫৬) টাঙ্গাইল বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মঞ্জুরুল করিম। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানায় ফেসবুকে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জিডি করেন (জিডি নং- ১০১৩) বন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা খাঁন জুলফিকার আলী। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ থানায় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জিডি করেন (জিডি নং- ১২৯৭) ফরেস্ট গার্ড মো. আবুল কালাম আজাদ।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফরেস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আমিরুল হাছান বলেন, “বর্তমান সময় বন বিভাগকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া পেজ এবং আইডি ব্যবহার করে নিজেদের ইচ্ছে মতো গল্প কিচ্চা বানিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। এসব মিথ্যা ও বানোয়াট লেখা এবং ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দেখা যায়, লেখাতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, পারিবারিক ও সামাজিক মানসম্মান নষ্ট করার জন্য এসব অপকর্ম চালানো হচ্ছে।”
বাংলাদেশ ডিপ্লোমা বনবিদ পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারে অংশ নেয়া দুষ্টচক্র বন বিভাগের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। বন বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এতে চরম বিব্রত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। বন বিভাগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় জিডি করা হয়েছে। বন বিভাগের সুনাম রক্ষায় এসব চক্রের সদস্যদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
বাংলাদেশ ফরেস্ট গার্ড কল্যাণ সমিতির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সভাপতি জসীম উদ্দিন বলেন, “যারা বন বিভাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। কারো চরিত্র হননের চেষ্টা জঘন্যতম অপরাধ। বনকর্মীরা কতো ত্যাগ, কতো লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বন রক্ষা করতে গিয়ে ফরেস্টার সাজ্জাদ, ইউসুফ প্রাণ দিয়েছে। নিত্যদিন কোথাও না কোথাও বন রক্ষা করতে গিয়ে বনকর্মীরা আহত হচ্ছেন। অথচ বন বিভাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে উঠেপড়ে লেগেছে কয়েকটি চক্র।”
বাংলাদেশ ফরেস্ট রেঞ্জার’স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সকলকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “ভালো কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকুক এটাই কাম্য। দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো তথ্য যাচাই বাছাই করে সংবাদ প্রচার করে। অন্যদিকে ভুয়া ফেসবুক পেজ ও আইডিগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়, অপপ্রচার চালায়। বন বিভাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করি।