একগাদা গুরুতর অভিযোগ মাথায় নিয়ে চবির প্রোভিসি প্রার্থী অধ্যাপক বেনু কুমার 

নিজস্ব প্রতিবেদক 

বেনু কুমার দে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। কখনো আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করে আওয়ামীপন্থী এই শিক্ষক সমালোচিত। আবার কোচিং বাণিজ্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সনাতন শিক্ষক পরিষদ এবং সনাতন ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর এই সংগঠনগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে উপাচার্যদের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায়ের অভিযোগও আছে তার শিক্ষকতা জীবনের ঝুড়িতে৷

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন না করেও নানা কারণে সমালোচিত এই শিক্ষক এবার হতে চান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের অভিযোগ, বেনু কুমার দে’র বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ বিরোধীতা করেছিলেন।

তারা জানিয়েছেন, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে যে সাম্প্রদায়িক গ্রুপটি চট্টগ্রাম নগরজুড়ে অপপ্রচার চালিয়েছিল সে গ্রুপটি নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক বেনু কুমার দে। সে নির্বাচনে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধাচরণের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এই শিক্ষকের নেতৃত্ব নগর জুড়ে চালানো হয় প্রচারণা। যার ফলাফল গিয়েছিল বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুর আলমের ঘরে।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক পদে বেনু কুমার দে দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি কখনো ডিন, সিন্ডিকেট সদস্য, প্রভোস্ট, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পদেই দায়িত্বে ছিলেন না। এমনকি তিনি কোনো দিন বিভাগের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্বে ছিলেন না। কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকা এই শিক্ষকের পক্ষে উপ-উপাচার্যের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালন করা দুঃসাধ্য বলেই মন্তব্য করছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চবি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নির্বাচনে পরাজিত হয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছেন বেনু কুমার দে। নিজ অনুষদের শিক্ষকদের কাছেই যার গ্রহণযোগ্যতার এই হাল- তিনি উপ-উপাচার্য পদে মানানসই কি-না তা নিয়ে চলছে কানাঘুঁষা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতন শিক্ষক পরিষদ এবং সনাতন ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছেন বেনু কুমার দে। এ দুটি সংগঠনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ‘মাথা বিক্রি’ করে এই শিক্ষক বিভিন্ন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপালনকারী উপাচার্যদের কাছ থেকে নিয়োগসহ বিভিন্ন ফায়দা নিতে এ সংগঠনগুলোকে বেনু কুমার দে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক জানান, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেনের হাতে গড়া চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু পরিষদ ভেঙে দিয়ে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবি হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. সেকান্দর খানের স্ত্রী অধ্যাপক সৈয়দ তাহেরাকে ওই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন বেনু কুমার দে’র বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সেকান্দর খান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানের মালিকানাধীন ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বর্তমানে কর্মরত।

অভিযোগ রয়েছে, এই বঙ্গবন্ধু পরিষদে আওয়ামী লীগ, মহামান্য রাষ্ট্রপতি এব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নানা সময় কটুক্তিকারী হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়া চবি নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রহমান নাসির উদ্দিনকে বিভিন্ন উপলক্ষে আমন্ত্রিত অতিথি করা হয়। যা নিয়ে প্রগতিশীল নাগরিক সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক বেনু কুমার দে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তিন দশক ধরে কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত। উনি নিজেই চট্টগ্রাম শহরে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন। যেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উনি কোচিং করিয়ে আসছেন। এমনকি করোনার সময়ে সরকারি সিদ্ধান্তে লকডাউনের সময়েও উনি কোচিং বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা ও মর্যাদার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কোচিং ও টিউশনি করানো অসঙ্গতিপূর্ণ বিবেচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় Employees (Efficiency & Discipline) Statute 3(g) ধারা অনুযায়ী সিন্ডিকেটের পূর্বানুমতিব্যতীত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষকের অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে কোচিং-টিউশনি কিংবা নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিষিদ্ধ ও চাকুরিবিধির লঙ্ঘন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে। বিগত বছর ০৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই বিষয়টি সবাইকে পুনঃব্যক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক বেনু কুমার দে’র বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় চাকরির মেয়াদ রয়েছে মাত্র ৫ মাস। এমন তথ্যই জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক বেনু কুমার দে চট্টগ্রাম সংবাদকে বলেন, ‘এসব অবান্তর প্রশ্ন। এগুলোর কোনো ভিত্তি নাই। তাই এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাইনা।’ বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.