শিক্ষিকাকে হেনস্তার পর ‘পায়ে ধরে’ ক্ষমাপ্রার্থনা ছাত্রলীগ নেতার

চট্টগ্রাম ব্যুরো: পাঠদান চলাকালীন অনুমতি না নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢোকার প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষিকাকে চরমভাবে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রলীগ নেতা ও তার কয়েকজন অনুসারীর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে ওই ছাত্রনেতা ‘পায়ে ধরে’ ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন হেনস্তার শিকার শিক্ষিকা ও অধ্যক্ষ।

মঙ্গলবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক ববি বড়ুয়ার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

কলেজের অধ্যক্ষ আ ন ম সরওয়ার আলম জানিয়েছেন, কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী রাকিব হায়দার কয়েকজন তরুণকে নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। রাকিব নগরীর ডবলমুরিং থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।

১৩ বছর ধরে এমইএস কলেজের প্রভাষক পদে থাকা ববি বড়ুয়া প্রথম এ ধরনের হেনস্থার শিকার হয়েছেন জানিয়ে বলেছেন, ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ববি বড়ুয়া জানান, বেলা ১২টার দিকে তিনি একাদশ শ্রেণিতে নতুন ভর্তি হওয়া মানবিক বিভাগের এ-শাখার শিক্ষার্থীদের পাঠ দিচ্ছিলেন। শ’খানেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে ছিলেন।

‘হঠাৎ ছাত্রলীগের রাকিব আরও কয়েকজন নিয়ে ক্লাসে ঢুকে পড়ে। নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কথা বলা শুরুর মুহূর্তে আমি তাদের বাধা দিই। অনুমতি ছাড়া ক্লাসে কেন ঢুকেছে সেটা জানতে চাই। তখন রাকিব যে ভাষায় আমাকে আক্রমণ করেছে এবং যে ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলেছে, আমি সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। সে যেভাবে আমাকে হেনস্তা করেছে সেটা একজন শিক্ষক হিসেবে বলা আমার জন্য চরম অপমানের, লজ্জার। আমি হতভম্ব হয়ে যাই। দ্রুত ক্লাস থেকে বেরিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে অভিযোগ করি।’

জানা গেছে, ববি বড়ুয়ার সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের একপর্যায়ে রাকিব ও তার অনুসারীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশে থাকা ছাত্রছাত্রীরা সেখানে জড়ো হন। শিক্ষিকাকে হেনস্তার বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়।

অন্যদিকে এ ঘটনায় ছাত্রলীগের দুইপক্ষেও উত্তেজনা তৈরি হয়। একপক্ষ শিক্ষকদের পক্ষে এবং আরেকপক্ষ বিপক্ষে অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে খুলশী থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এর মধ্যে অধ্যক্ষ তার কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা রাকিব হায়দারকে ডেকে পাঠান। অধ্যক্ষের কক্ষে রাকিবসহ তার সঙ্গে থাকা তরুণরা গিয়ে শিক্ষিকা ববি বড়ুয়ার পায়ে ধরে ক্ষমা চান।

অধ্যক্ষ আ ন ম সরওয়ার আলম বলেন, ‘রাকিব আমাদের কলেজের সাবেক ছাত্র। সে যে ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে, সেটা সব শিক্ষকের জন্য অপমানের, আমরা স্তম্ভিত। আমি যখন তাকে ডেকে নিই, ওই শিক্ষিকাও বলেছেন যে- আমি তো তোমাদের মায়ের মতো, আমার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ তোমরা করলে কিভাবে? তখন তারা বুঝতে পেরেছে যে অন্যায় করেছে। তারা পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছে।’

অধ্যক্ষ জানান, ঘটনা তদন্তে উপাধ্যক্ষ রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

ববি বড়ুয়া  বলেন, ‘শত, শত ছাত্রছাত্রীর সামনে অপমান করে অধ্যক্ষের রুমে গিয়ে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে কী ক্ষমা করা যায়? আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমি সবসময় ক্লাসে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিক আচরণের পাঠ দিই। আমার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ আমি মানতে পারছি না কোনোভাবেই।’

পুলিশের কাছে অভিযোগ করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছেলেগুলো তো আমার সন্তানের মতো। কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো ? আমি পুরো ঘটনা শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল স্যারকে অবহিত করেছি।’

জানতে চাইলে খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা  বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয় ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সমস্যা হচ্ছে বলে জানালে আমরা কলেজে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি একজন শিক্ষিকার সঙ্গে ছাত্রলীগের এক নেতা অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আমরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করলে বিবদমান নেতাকর্মীরা সরে যায়। শিক্ষিকাকে হেনস্তা করার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ছাত্রলীগ নেতা রাকিব হায়দারের মোবাইলে একাধিকবার কল দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.