শহিদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের ওপর ‘যুবলীগ-ছাত্রলীগের’ হামলা

 

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম নগরীতে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর সময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আক্রান্তরা সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সংগঠনটির অন্তত ১২ জন শরীরে আঘাত পেয়েছেন। ছাত্র ইউনিয়ন হামলার জন্য দক্ষিণ জেলা যুবলীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে। তবে কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীও এসময় তাদের ওপর চড়াও হয় বলে জানান।

শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে শহিদ মিনারে প্রবেশের প্রতিবাদ করায় এবং স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসবিরোধী স্লোগান দেওয়ায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে বলে দাবি ছাত্র ইউনিয়নের।

মঙ্গলবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নগরীর মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অস্থায়ী কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গনে এ ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ জেলা যুবলীগ হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের দাবি, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা একজন জ্যেষ্ঠ্য আওয়ামী লীগ নেতাকে অপমান করায় তারা প্রতিবাদ করেছে এবং এসময় সামান্য ‘হাতাহাতি’ হয়েছে।

জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মিউনিসিপ্যাল বিদ্যালয়ের বিপরীতে সংগঠনের কার্যালয় দারুল ফজল মার্কেটের সামনে থেকে প্রভাতফেরি নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা শহিদ মিনারে যান। ফুল দেওয়ার জন্য তারা পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের নির্ধারিত সারিতে দাঁড়ান। শহিদ মিনারের ওঠার আগমুহূর্তে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এ্যানি সেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শৃঙ্খলা মেনে সারিবদ্ধভাবেই শহিদ মিনারের সামনে পৌঁছাই। মহিলা লীগের নেতাকর্মীরা প্রথমে পেছন থেকে এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আমরা কিছু বলিনি, শুধু একুশ নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম। এরপর দক্ষিণ জেলা যুবলীগের নেতাকর্মীরা এসে আমাদের সামনে দিয়ে শহিদ মিনারে উঠে যায়। তাদের অনেকের পায়ে জুতা ছিল। আমরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে জুতা পায়ে শহিদ মিনারে ওঠার প্রতিবাদ করি। এসময় তারা আমাদের ওপর হামলা করে। আমরা স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগান কেন দিচ্ছি- এমন কথা বলে মারধর শুরু করে।’

ঘোষণামঞ্চে দাঁড়িয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী ও সাংবাদিক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী। ঘটনার সময় ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী মঞ্চ থেকে নেমে যুবলীগের নেতাকর্মীদের থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। আর রিয়াজ হায়দার বারবার মাইকে বলছিলেন, ‘যুবলীগের বন্ধুরা, এটা শুধু আপনাদের শহিদ মিনার নয়, এই মঞ্চ সবার। আপনারা বিশৃঙ্খলা না করে সরে যান।’ ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদেরও শান্ত থাকার আহ্বান জানাতে শোনা যায়।

কিন্তু এরপরও যুবলীগের নেতাকর্মীদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ অব্যাহত ছিল জানিয়ে জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক টিকলু কুমার দে সারাবাংলাকে বলেন, ‘ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীর হস্তক্ষেপে মিনিট পাঁচেক পর শহিদ মিনার থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীরা নেমে যান। আমরা স্লোগান দিতে দিতে শহিদ মিনারে ফুল নিয়ে উঠি। তখন নিচে দাঁড়িয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীরা, আমরা সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগান দিলে আবার তারা হামলার হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের কয়েকজন হট্টগোল করে তেড়ে এসে আমাদের নামিয়ে দিতে উদ্যত হয়।’

টিকলু জানান, ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে মাঝখানে দাঁড়ালে ফুল দিয়ে নিচে নামেন তারা। তখন আবার যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাদের দিকে এগিয়ে এলে তারাও প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। হট্টগোলের মধ্যে ইফতেখার সাইমুলের শরীরে কেউ আঘাত করেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তখন কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের ব্যানারের পেছনে থাকা কয়েকজন এসে যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগ দেয়।

হামলাকারীরা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ইমরান চৌধুরী ও কোতোয়ালী থানার সভাপতি অয়ন সেনগুপ্তকে আঘাত করে তাদের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলে। জেলা যুব ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিদুল সামির ও সদস্য বিপ্লব দাশ গিয়ে তাদের রক্ষা করেন। এসময় যুব ইউনিয়নের দুই নেতার ওপরও হামলাকারীরা চড়াও হয় বলে অভিযোগ করেন টিকলু কুমার দে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছাত্র ইউনিয়ন তাদের মতো করে ফুল দিয়েছে। আমরা তো এর আগেই দিয়ে সেখান থেকে চলে গেছি। জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মফিজ ভাই (মফিজুর রহমান) ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা হয়নি। সেখানে ভিড়ের মধ্যে একটু হইচই হয়েছে। আমি বরং আমাদের ছেলেদের বলেছি কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করতে। এরপর সবাই চুপ হয়ে যায়।’

শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এবং জুতা পায়ে শহিদ মিনারে প্রবেশের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই আসে না। শহিদ মিনারের পবিত্রতা সম্পর্কে কী আমরা জানি না? শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে শহিদ মিনারে ফুল দেইনি। এটা মিথ্যা অভিযোগ।’

কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ছাত্র ইউনিয়নের পেছনে ছিলাম। আমাদের পেছনে ছিল মহানগর ছাত্রলীগ। ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা কিছু স্লোগান দিচ্ছিল, সেগুলো নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছে দেখেছি। তবে আমরা তাদের কিছু বলিনি। কিন্তু তারা আমাদের ইফতেখার সাইমুল ভাইয়ের মতো একজন সিনিয়র নেতাকে অপমান করে কথা বলছিল। তখন আমরা গিয়ে প্রতিবাদ করেছি। সেখানে সামান্য হাতাহাতি হয়েছে। সেটা সেখানেই মিটে গেছে।’

জানতে চাইলে শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা মারামারি করছিল। আমি তাদের থামাতে গিয়েছিলাম। সেখানে ভিড়ের মধ্যে টুকটাক সমস্যা হয়। এটা তেমন কিছু নয়। সবগুলোই তো আমাদের সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে কোনো সংগঠন তো আর শহিদ মিনারে আসেনি।’

নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সুশৃঙ্খলভাবে ফুল দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে কারও কোনো সমস্যা হয়নি। কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগও আমাদের সঙ্গে ছিল। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কিছু করেছে কি না, সেটা আমাদের জানা নেই।’

জেলা ছাত্র ইউনিয়ন তাদের তিন নারী কর্মীসহ ১২ জন শরীরে আঘাত পেয়েছেন বলে দাবি করেছে। তারা হলেন— ইমরান চৌধুরী, মো. অর্ণব, অয়ন সেনগুপ্ত, শুভ দেবনাথ, কিংশুক বণিক, এস এম নাবিল, বর্ষা দেবী, মুক্তা পাল, শিরিন আক্তার, মিজানুর রহমান আরিফ, সৌম্য মল্লিক এবং মোহাইমেনুল ইসলাম।

জানতে চাইলে শহিদ মিনারে থাকা কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আতিক আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভিড়ের মধ্যে একটু হট্টগোল হয়েছে। মারামারি, হামলা এমন কিছু হয়নি। আমি নিজে ছিলাম। যখন বেশি ভিড় হয়েছিল তখন পুলিশ শহিদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলা রোধ করে।’

এর আগে, সোমবার রাতে একুশের প্রথম প্রহরেও শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর সময় বিশৃঙ্খলা ঘটে। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ্য নেতাদের সঙ্গে যাওয়া তাদের অনুসারীরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আগে ফুল দিতে উঠে যায়। এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতিতে সেখানে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের ওপর যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জেলা যুব ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ চৌধুরী।

বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বরের মতো জাতীয় দিবসে দেখা যায়, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগসহ সরকার দলীয় সংগঠনগুলো নিয়মশৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে, সারিভঙ্গ করে শহিদ মিনারে উঠে যায়। এবারও একই কাজ করায় ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিবাদ করেছে। তখন তারা নির্বিচারে হামলা করে। সরকার দলীয় সংগঠনগুলোর এমন স্বৈরাচারি আচরণের জবাব সাধারণ মানুষ দেবে। স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন লড়াই জারি রাখবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.