নিজস্ব প্রতিবেদক
উপাচার্যের ক্ষমতাবলেই কেবল নয়, ফ্যাকাল্টি কমিটির সিদ্ধান্তেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বি-১ উপ-ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে আনা হয়েছে। ভর্তির জন্য নির্ধারিত আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থী পাস না করার আশংকা থেকে কলা ও মানববিদ্যা অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্তে পাস নম্বর কমিয়ে আনা হয়।
ফ্যাকাল্টি কমিটির এ সুপারিশ বাস্তবায়নে উপাচার্য সম্মতি প্রদান করেছেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে এই ইউনিটে কোনো শূন্য থাকার আর সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক অতীতেও একই প্রক্রিয়ায় এই ইউনিটে পাস নম্বর কমানো হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিরোধী একটি চক্র এ বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরকার বিরোধী কিছু ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে একজন ডিনের নেতৃত্বে এই চক্রটি প্রায় সময় উপাচার্য ও প্রশাসনকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে সচেষ্ট থাকে। ৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দিপু মনির আগমনকে সামনে রেখেও ওই চক্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চক্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ফ্যাকাল্টি কমিটি শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পাস নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৩ এবং কোটায় পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৫ থেকে কমিয়ে ২৮ করা হয়েছে।
নির্ধারিত নিয়মে পাসের হার কম হওয়ায় গত ২৫ মে কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় পাস নম্বর কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। অনুষদের ডিন ও ভর্তি পরীক্ষার বি-ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল হকের সভাপতিত্বে এ সভায় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের সকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাস নম্বর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৪০ নম্বরের পরিবর্তে ৩৩ নম্বর এবং কোটায় পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৫ নম্বরের পরিবর্তে ২৮ নম্বর নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বিষয়টি কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটির (কোর কমিটি) পরবর্তী সভায় রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত হয়।
কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন ও ভর্তি পরীক্ষার বি-ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, বি-১ উপ-ইউনিটে ১২৫টি আসনের বিপরীতে পাস করেছিল ১৫২ জন। পাস করা শিক্ষার্থীদের অনেকে অন্য ইউনিট বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পরীক্ষা দিয়েছেন সেখানেও ভর্তি হতে পারেন। যার ফলে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ধারণা করছি ওই উপ-ইউনিটের বিভাগগুলোর অর্ধেক আসন ফাঁকা থেকে যেতে পারে। তাই আমরা পাসের হার কিছুটা বাড়ানোর জন্য বি-ইউনিট এবং বি-১ উপ-ইউনিটের কমিটির সকল সদস্যদের সঙ্গে বসে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তীতে এ বিষয়ে উপাচার্যের কাছে সুপারিশ করা হলে তিনি সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ফলাফল সংশোধনের অনুমতি দেন।
ভর্তি কমিটির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া উপাচার্য এককভাবে এমন অনুমতি দিতে পারেন কি-না জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ অ্যাক্ট ১৩(সি) ধারা অনুযায়ী উপাচার্যকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতাবলে তিনি এ অনুমতি দিতে পারেন। তাছাড়া এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে, বিষয়গুলো এভাবেই সমাধান করা হয়েছে। আগের ডিনদের সঙ্গে কথা বললে আপনি সেটা জানতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ এক্ট ১৩(সি) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিষয়ে উদ্ভূত কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে উপাচার্যের নিজস্ব বিবেচনায় তাৎক্ষণিক কোনো কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক বিবেচিত হলে, তিনি স্বীয় বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন এবং পরবর্তী নিকটতম সময়ের মধ্যে গৃহীত কার্যব্যবস্থা অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করবেন’।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিরোধী একটি পক্ষ এ বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার করছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের গত শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় একই ইউনিটে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই শূন্য আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তখন কোনো ডিন বা কোর কমিটি আপত্তি তুলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক এক ডিন বলেন, ভর্তি পরীক্ষার কোর কমিটি কোনো সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ পর্ষদ নয়। উপাচার্য ও সিন্ডিকেটকে যেভাবে ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ ক্ষমতা দিয়েছে। এই অধ্যাদেশে কোর কমিটির কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয় করতেই এ কমিটি ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন পর্ষদের সদস্যদের এখানে রাখা হয়। এমসিকিউ পদ্ধতিতে মেধা যাচাই করার পর আসন শূন্য রেখে দেওয়া মানে উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ করা। যা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার পরিপন্থি। সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টি তাদের বিভাগ ও ইনস্টিটিউট প্রধানরা এ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের জাতিরজনক জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদারনীতির আলোকে প্রণীত ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ এ ধরণের জরুরি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ১৩(সি) ধারায় ক্ষমতা প্রদান করেছে।
একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জানান, ২০ মে সি-১ ও সি-২ ইউনিটের পরীক্ষা বিবিএ অনুষদের ডিন মহোদয় একক সিদ্ধান্তে এক দিন পিছিয়ে দিয়েছে৷ বিবিএ অনুষদ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোর কমিটির মিটিং আহবান করেনি। অথচ কোর কমিটির মিটিংয়েই এই ইউনিটের পরীক্ষা গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল। যদি কোর কমিটি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে বিবিএ অনুষদ কর্তৃপক্ষ কেন তা কোর কমিটির সভায় পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে আলোচনা করেনি। সে হিসেবে এ বছর কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অমান্য করার প্রথম নজির স্থাপন করেছে বিবিএ অনুষদ কর্তৃপক্ষ।
কলা ও মানববিদ্যা অনুষদভুক্ত এই উপ-ইউনিটের পরীক্ষায় ৯১৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও পাস করেন ১৫২ জন। বি-১ উপ-ইউনিটের অধীনে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ৬০, নাট্যকলা বিভাগে ৩৫ এবং সংগীত বিভাগে ৩০টি আসন রয়েছে।
সেই হিসেবে মোট ১২৫টি আসনের বিপরীতে ১৫২ জন পাস করায় সবগুলো আসন পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
এই ইউনিটে গত বছর ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষেও আসন শূন্য থাকায় ফ্যাকাল্টি কমিটির সভার সিদ্ধান্তক্রমে উপাচার্য বরাবর সুপারিশ হয়। পাস নম্বর কমিয়ে শূন্য আসনে
শিক্ষার্থী ভর্তির এ সুপারিশ গ্রহণ করে সম্মতি প্রদান করেছিলেন উপাচার্য। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম বলেই ধরে নেওয়া হয়।