খাগড়াছড়ি:অর্ধশতাধিক ইটভাটায় যাচ্ছে বনের কাঠ, নিয়ন্ত্রণে ডিএফও ফরিদ মিঞা

ভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত এই জনপদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য-

সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম থেকে  

খাগড়াছড়িতে নির্বিচারে অশ্রেণিভুক্ত বন উজাড় হচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক বন উজাড়ে একদিকে পাহাড় হারাচ্ছে তার ভারসাম্য, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে জনজীবনে।

 

পার্বত্য অঞ্চলে চার শ্রেণির বন রয়েছে। সেগুলো হলো- সংরক্ষিত বন, রক্ষিত বন, ব্যক্তিমালিকাধীন বন ও অশ্রেণিভুক্ত বন। তবে অধিকাংশই অশ্রেণিভুক্ত বনের আওতাভুক্ত।

দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে। এসব বনের কাঠ চলে যাচ্ছে ইটভাটা, করাতকল ও বিভিন্ন তামাকচুল্লিতে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক বন।

 

জানা যায়, খাগড়াছড়িতে সংরক্ষিত বনের পরিমাণ ৬ হাজার ২০০ একর এবং অশ্রেণিভুক্ত বনের আয়তন প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩২ একর। বন রক্ষায় এখনই প্রশাসন কঠোরভাবে তৎপর না হলে ইটভাটা, তামাকচুল্লি আর করাতকল গিলে খাবে এ বনকে।

 

খাগড়াছড়িতে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ৪৩টি। সবুজ অরণ্যজুড়ে এখন ইটভাটার ক্ষত। সবুজ পাহাড় এবং কৃষিজমিতে জ্বলছে ইটভাটার চিমনি।

 

ভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। ভাটা নির্মাণের জন্য পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে। এসব ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ।

সূত্র বলছে, প্রতিবছর জেলায় অক্টোবর মাসে ইটভাটাগুলোর কাজ শুরু হয় এবং তা চলে মে থেকে জুন পর্যন্ত। বৃষ্টির আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ইটভাটায় ১২-১৩ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রত্যেক রাউন্ডে সাত থেকে আট লাখ ইট পোড়ানো হয়। আর প্রত্যেক ইটভাটায় বছরে গড়ে ১ কোটি ইট উৎপাদন হয়।

খাগড়াছড়ির সব ভাটায় বছরে প্রায় ৪৩ থেকে ৫০ কোটি ইট তৈরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ থেকে ৩৮৭ কোটি টাকা (প্রতি হাজার গড়ে ৭-৯ হাজার টাকা দরে)।

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি রাউন্ড ইট পোড়াতে প্রায় ৮-৯ হাজার মণ (১ মণে ৪০ সের) জ্বালানি কাঠ লাগে এবং এক মৌসুমে একটি ইটভাটায় গড়ে কাঠ পুড়ে প্রায় ১ লাখ মণ। সেই হিসাবে ৪৩ ইটভাটায় বছরে কমপক্ষে ৪৩ লাখ মণ কাঠ পুড়ছে। ইটভাটা এবং ভাটা শ্রমিকের রান্নাবান্নার কাজসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার গাছ পুড়ছে।

 

 

এ ছাড়া পুরো জেলার আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় শতাধিক করাতকল। শুরুতে বেশির ভাগই অবৈধ থাকলেও সম্প্রতি অধিকাংশই বৈধতা পেয়েছে। যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের মালিকানায়।

 

বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো সুযোগ বা নিয়ম নেই। তবে এসবের তোয়াক্কা করেন না বনখেকোরা। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরেই করাতকল স্থাপন করে দিনে-রাতে কাটা হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ।

 

 

সরেজমিনে, করাতকল মিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি করাতকলে দৈনিক অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠ চিরানো হয়। সে হিসাবে খাগড়াছড়ি জেলার করাতকলগুলোতে প্রাত্যহিক গড়ে অন্তত সাড়ে ২২ হাজার ঘনফুট কাঠ চেরা হয়। বছর শেষে যার পরিমাণ ৮০ লাখ ঘনফুট ছাড়িয়ে যায়।

 

এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে এ বছর ছয় শতাধিক হেক্টর কৃষিজমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। আর এ তামাক পাতা পোড়াতে প্রয়োজন হবে প্রায় চার লাখ মণ কাঠ। যার সবই সংগ্রহ করা হচ্ছে সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে।

 

সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে গাছ কাটতে হলে সরকারিভাবে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু নজরদারি ও তদারকির অভাবে বিনা অনুমতিতে বনের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনখেকোরা।

প্রাকৃতিক বন উজাড় করে রাবার ও ফলদ বাগান তৈরি, বনের গাছ চুরির কারণে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক বন। এ ছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতা-গুল্ম। বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের ওপর নির্ভরশীল বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে বন বিভাগের কোনো নজরদারি নেই।

 

অনেকেই জানিয়েছেন ‘এ সংকট নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে অবাধে বন ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে। পাহাড়ে বনের কাঠ কাটার ওপর একটি দীর্ঘ সময়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা না গেলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে।’

 

একসময় পাহাড়ে ভাল্লুক, বাঘ, সাম্বার হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি দেখা গেলেও আজ তা বিপন্ন। একসময় হর্নবিলসহ অনন্ত ৩৭৫ প্রজাতির পাখি দেখা যেত, যা আজ হারিয়ে গেছে।

 

এদিকে খাগড়াছড়ির একাধিক ইটভাটার মালিক প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, খাগড়াছড়ি রেঞ্জ, মাটি রাঙ্গা রেঞ্জ, মানিকছড়ি রেঞ্জ, রামগড় রেঞ্জ, পানছড়ি রেঞ্জ, জালিয়া পাড়া রেঞ্জকে ম্যানেজ করেই এই খাগড়াছড়ির অর্ধশতাধিক ইটভাটা পরিচালিত হয়।

 

এদিকে খাগড়াছড়ির প্রতিটি রেঞ্জার চাইলে  নিজের মতো করে দূর্নীতি করতে পারেননা। তাদেরকেও মূলত ডিএফও মো: ফরিদকে ম্যানেজ করা লাগে।

শুধু তাই নয় করাতকলের মালিক এবং করাতকলে চিরাতে আনা কাঠের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সবকিছুই ডিএফও’র নখদর্পনে। ইটভাটার মালিক থেকে শুরু করে কাঠ ব্যবসায়ীদের কয়েকজন নির্দিষ্ট রেঞ্জারের মাধ্যমে পুরো খাগড়াছড়ি জেলাকে নিয়ন্ত্রণ করেন ডিএফও ফরিদ মিঞা,একাধিক বড় বড় কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে সরাসরি বৈঠক করেন তিনি নিজেই।কাঠ ব্যবসায়ী আট ইটভাটা মালিকদের সাথে সমন্বয় করার জন্য এই বিভাগের ২জন রেঞ্জার সরাসরি কাজ করেন বলেও প্রতিবেদককে সূত্র নিশ্চিত করেছেন। 

 

জানাযায়, বনখেকোদের দৌরাত্ম্য বন্ধে খাগড়াছড়িতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও অবৈধভাবে বনের কাঠ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না।

খাগড়াছড়িতে বিনষ্ট হচ্ছে সম্পদ, কমছে জলধারা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের দাবি
গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত চিত্তরঞ্জন চাকমা,  আলো জীবন চাকমাসহ একাধিক শ্রমিক জানান, মূলত পাহাড় খাস হলেও বনের মালিকানায় রয়েছে স্থানীয়রা।

 

আমরা মালিকদের কাছ থেকে পাহাড়ের গাছ কিনে নিই। ইটভাটায় গাছ সরবরাহকারী দালালরা (মাঝি) স্থানীয়দের কাছ থেকে পাহাড়ের গাছ কিনে নেয়। তারপর সেসব গাছ নির্বিচারে কাটা হয়। গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত প্রতিটি শ্রমিকের মজুরি ৪০০ টাকা। সারাদিনে অন্তত ৫শ মণ গাছ কর্তন করেন তারা।

 

এই বিষয়ে খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞাকে বেশ কয়েকদিন ধরে কল করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। এদিকে জালিয়াপাড়া রেঞ্জসহ কয়েকটি বিটের অনিয়ম সংক্রান্ত, ডিএফও ফরিদ মিঞাকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সোস্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হলে সেই বিষয়েও জানা সম্ভব হয়নি।

পর্ব-০১

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.