হাটহাজারীতে সশস্ত্র হামলা লুটপাট ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

দোকান ও বসতবাড়ি ভাঙচুর স্বর্ণালংকার নগদ টাকা ও মালামাল লুট আতঙ্কে একাধিক পরিবার দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি স্থানীয়দের

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা এলাকায় সশস্ত্র হামলা ভাঙচুর লুটপাট ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী জান্নাতুল ফেরদৌস ৪৮ বাদী হয়ে চিফ জুডিশিয়ান ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এ অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অনেক পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

মামলার বাদী জান্নাতুল ফেরদৌস উপজেলার খন্দকিয়া গ্রামের মুন্সী মিস্ত্রি বাড়ীর বাসিন্দা। আদালতে দায়ের করা অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চাঁদাবাজি দখলবাজি ,মাদক ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছে। তাদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না। স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে তারা অনেক সময় সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন কাজে বাধ্য করত বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মোঃ বেরাল ৪৫ মোঃ মান্নান ২০ ও মোঃ ছৈয়দ ২৪ কে। এছাড়া জানে আলম কালু ২৫ আব্দুল মান্নান ৬৫ আলমগীর ৩০ বদরুল প্রবাসী কফিল ৩০ জাহেদ ৫০ ইলিয়াছ ৪০ বাহাদুর ৪০ ও সুমন ৩৫ সহ আরও অজ্ঞাত ৫ থেকে ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে তাদের সবার বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।

মামলার বর্ণনায় বাদী জানান তার ছেলে আহমদ রেজা শাকিল ২১ স্থানীয় ব্যবসায়ী আরমান নামের এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে অভিযুক্তদের ইট ও বালির ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে এলাকায় কোনো নির্মাণ কাজ শুরু হলেই অভিযুক্তরা জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে ইট ও বালি নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করত। তাদের নির্ধারিত স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রী না নিলে নানা ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো।

বাদীর দাবি আরমানের কাছ থেকে নির্মাণসামগ্রী নেওয়ার কারণে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে। এমনকি আরমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কারণে বাদীর ছেলে শাকিলকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময় শাকিলকে ডেকে নিয়ে হুমকি দেয় এবং আরমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ না করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

অভিযোগে বলা হয়েছে এই বিরোধের জের ধরেই অভিযুক্তরা শাকিল ও তার নিয়োগকর্তা আরমানকে হত্যার পরিকল্পনা করে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এলাকায় অভিযুক্তরা গোপনে একটি বৈঠক করে এবং সেখানে আরমান ও শাকিলকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১টার দিকে কয়েকজন অভিযুক্ত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাদীর বাড়িতে গিয়ে তার ছেলেকে খুঁজতে থাকে। সে সময় বাদী দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ঘরের দরজা ও জানালা ভাঙচুর করে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে হুমকি দিতে থাকে। তারা বলে ভবিষ্যতে যেন শাকিল আরমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে।

বাদী আরও অভিযোগ করেন এর পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি রাত প্রায় ১১টার দিকে অভিযুক্তরা আবারও সংঘবদ্ধভাবে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার বাড়ি ও সংলগ্ন দোকানে হামলা চালায়। প্রথমে তারা বাদীর স্বামীর চায়ের দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শুরু করে এবং দোকানের বিভিন্ন মালামাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে। এরপর তারা জোরপূর্বক বসতঘরে প্রবেশ করে তছনছ চালায় এবং ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

অভিযোগে বলা হয়েছে হামলাকারীরা বাদীর ঘর থেকে এক ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন এবং দোকানের মালামাল কেনার জন্য রাখা নগদ ৩০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে প্রায় দুই লক্ষ টাকার ক্ষতি করা হয়।

মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে বাদীর স্বামীর চায়ের দোকানে থাকা একটি ওয়ালটন ব্র্যান্ডের ফ্রিজ জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয় যার মূল্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া দোকানের টেবিল চেয়ারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়।
দোকানে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির বিস্কুট দুধ চাপাতা চিনি এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যও লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে করে ভুক্তভোগী পরিবারের আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ঘটনার সময় প্রধান আসামি বেরালের হাতে থাকা লাঠি দিয়ে বাদীকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই আঘাত তার কপালে লাগলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তার স্বামী ও আশপাশের লোকজনের চিৎকারে স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান ঘটনার সময় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই ভয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি। পরে লোকজন জড়ো হলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

 

মামলার বাদী আরও জানান হামলার পর অভিযুক্তরা চলে যাওয়ার সময় হুমকি দিয়ে বলে যায় এই ঘটনায় থানায় বা আদালতে অভিযোগ করলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলা হবে। ঘটনার পর আহত অবস্থায় তিনি স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেন এবং বর্তমানে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
বাদী অভিযোগ করেন ঘটনার পর তিনি সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পরে স্থানীয়ভাবে আপোষ মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হওয়ায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩২৩ ৩২৪ ৪৪৮ ৪২৭ ৩০৭ ৩৮০ ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা ছিনতাই দখলবাজি চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অনেক সময় অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
এলাকার কয়েকজন নারী ও পুরুষ জানান প্রায়ই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে হামলা চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একজন দিনমজুর ও রিকশাচালক অভিযোগ করেন তিনি নিজেও ওই সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন। তার দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে এবং তাকে মারধর করা হয়েছে। স্থানীয় এক নারী বলেন গত প্রায় দেড় বছর ধরে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে এবং প্রায়ই চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ভাঙচুর বা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও বলেন এসব ঘটনায় অনেক সময় থানায় অভিযোগ করলেও সঠিক বিচার পাওয়া যায় না। ফলে সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোঃ জাহিদুর রহমান হাটহাজারী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি বলেন ভুক্তভোগী আমাদের থানায় আসেননি। তিনি যদি আমার কাছে আসেন তাহলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে আমাকে কেউ অবগত করেনি।

ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চান এবং এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.